Home ইতিহাস ও জীবনী চিন্তার ইতিহাসে সেক্যুলারিজমের জন্ম কীভাবে হয়েছিলো?

চিন্তার ইতিহাসে সেক্যুলারিজমের জন্ম কীভাবে হয়েছিলো?

0

।। পিনাকী ভট্টাচার্য ।।

চিন্তার ইতিহাসে কীভাবে এই সেক্যুলারিজমের ধারণার উদ্ভব ঘটলো সেটা না বুঝলে সেক্যুলারিজমের ধারণার দার্শনিক ভিত্তি কী ছিলো সেটা আমরা বুঝতে পারবো না। আর এই চিন্তার শৃঙ্খল ধরে না এগুলে আমরা বুঝতে পারবো না- সেক্যুলারিজমের ধারণা নিয়ে আমরা আসলে কী করবো?

যারা সেক্যুলারিজমের পক্ষে এবং বিপক্ষে তাঁরা দুই পক্ষই খোলা মন নিয়ে আমার এই লেখাটা পড়বেন এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিবেন। আমার নিজের চিন্তা আমি প্রশ্ন আকারে বলবো, কিন্তু আপনি আমার নিজের চিন্তার অংশটুকু বাদ দিলেও বাকী ক্লাসিক্যাল দার্শনিক ও ঐতিহাসিক টেক্সটের আলোকে আপনার চিন্তাকে আপনি সংহত রূপ দিতে পারবেন এবং খামোখা ও অহেতুক বিতর্ক থেকে দুরে থাকতে পারবেন।

সেক্যুলারিজমের ধারণার উৎপত্তি পশ্চিমা চিন্তায় রাষ্ট্রের ধারণার উৎপত্তির শেষ পর্যায়ে। পশ্চিমা চিন্তায় রাষ্ট্র ধারণা প্রথম দানা বাধে দার্শনিক হবসের চিন্তায়। তাহলে হবসের আগে রাজার কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা নিয়ে কী ধারণা ছিলো? এই জায়গাটা ইন্টারেস্টিং।

ইউরোপে রাজাকে মনে করা হতো ঈশ্বরের মনোনীত প্রতিনিধি বা ডিভাইনলি সিলেক্টেড। ঈশ্বর রাজাকে দায়িত্ব দিয়েছেন পৃথিবীতে শাসন করার। এই রাজার ক্ষমতা অ্যাবসলিউট। আর সেইকারণেই ইউরোপের রাজতন্ত্র ছিলো অ্যাবসলিউট মনার্কি। তাহলে কিং তো নিজেই নিজেকে সাক্ষ্য দিতে পারবেন না যে তিনি ঈশ্বরের মনোনীত। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে বলতে হবে এই রাজা ঈশ্বরের মনোনীত। তাই ইউরোপের রাজার চার্চকে দরকার হতো তার বৈধতার সার্টিফিকেট নেওয়ার জন্য।

ইউরোপে রাষ্ট্র আর চার্চকে মাখামাখি করে না চললে বা একে অন্যের উপরে নির্ভর না করলে চলতো না। প্রাচ্যে এটা কখনো হয়নি। রাজাকে তার বৈধতার জন্য পুরোহিত, ভান্তে বা মওলানার দ্বারস্থ হতে হয়নি। রাজাকে প্রাচ্যে কখনোই ডিভাইনলি সিলেক্টেড বলে দাবী করা হয়নি। প্রাচ্যের রাজারা ধর্মকে ব্যবহার করেছে, আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে সেটা ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু তাদের কখনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে বৈধতা নিতে হয়নি।

আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, ইউরোপে সিংহাসনে বসার জন্য রাজার সাথে চার্চের প্রায়শই দ্বন্দ্ব হচ্ছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রাচ্যের সিংহাসনে বসা নিয়ে দ্বন্দ্বের ইতিহাস আমার জানা নেই। কারো জানা থাকলে আলোকিত করতে পারেন। এই কারণেই ইউরোপে আধুনিক রাষ্ট্রে চার্চের সাথে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কচ্ছেদ করতে হয়েছিলো। এই সম্পর্কচ্ছেদ চার্চের বা ধর্মের উপরে রাগ থেকে নয়, বরং প্র্যাক্টিক্যাল কারণে। এই সম্পর্কচ্ছেদ এই কারণে যে, তাদের চার্চের কাছে থেকে বৈধতা নেয়ার প্রয়োজন ফুরিয়েছে, এখন জনগণ ভোটের মাধ্যমে বৈধতা দেয়।

হবস রাজার ডিভাইন সিলেকশনের বদলে একটা শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার কথা বললেন। তিনি বললেন, মানুষ চরিত্রগতভাবে শয়তান এবং স্বার্থপর, তাই সে সারাক্ষণ নিজেদের মধ্যে এবং পরস্পরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকে। এই সার্বক্ষণিক যুদ্ধাবস্থা থেকে মুক্তির জন্য ডিভাইন সিলেকশনের বদলে এমন একজন শাসক দরকার, যে বিপুল শক্তিমান। তিনি তার নাম দিলেন লেভিয়াথান। লেভিয়াথান হচ্ছে ওল্ড টেস্টামেন্টের এক সামুদ্রিক দানব, যে বিপুল শক্তিশালী এবং অজেয়। হবস বললেন, এইরকম শাসক ছাড়া আমাদের এই শয়তানি চরিত্রের কারণে আমাদের জীবন হয়ে উঠবে ক্ষুদ্র, নিঃসঙ্গ, পাশবিক, কদর্য, দরিদ্র।

এরপরে জন লক এসে বললেন, মানুষ তিনটা ন্যাচারাল অধিকার নিয়ে পৃথিবীতে আসে। এই তিনটা অধিকার হচ্ছে লাইফ, লিবার্ট আর প্রপার্টি। এই অধিকারগুলো আদম পেয়েছিলো গডের কাছে থেকে। মানুষ এই ডিভাইন রাইট বা অধিকারকে প্রোটেক্ট করতে পারে না। শাসকের কাজ হচ্ছে মানুষের এই ন্যাচারাল অধিকারকে রক্ষা করা। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণার তিনটা মুলনীতি লাইফ, লিবার্টি আর সুখের সাধনা বা পারসুট অব হ্যাপিনেস। সম্পত্তি বা প্রপার্টিকে শুধু প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে সুখের সাধনা দিয়ে। তাহলে আমেরিকা এই মুলনীতি নিয়েছে কোথায় থেকে? ধর্মতত্ব থেকেই তো। আধুনিক রাষ্ট্রও এভাবেই ধর্মতাত্বিক প্রকল্প হয়ে ওঠে। জন লক শাসকের ডিভাইন রোলের কথা বলছেন না, তিনি বলছেন শাসিতের ডিভাইন রাইটের কথা।

হবসের আর লকের চিন্তার মধ্যে তফাত কোথায় কোথায়? হবস বলেছেন- আমাদের শয়তানি চরিত্র থেকে উদ্ভুত অরাজকতা থেকে বাঁচার জন্য শক্তিশালী শাসক দরকার। আর লক বলছেন- শাসিতের ডিভাইন অধিকার রক্ষার জন্য শক্তিশালী শাসক দরকার। হবস বলেছিলেন- সার্বভৌম ক্ষমতা থাকে শাসকের কাছে। লক বললেন- এই সার্বভৌম ক্ষমতা থাকে শাসিতের কাছে বা জনগণের কাছে। জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার কথা প্রথম বলেছেন জন লক।

হবস শাসকের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করতে চান নাই। তার মতে শাসক ঈশ্বরের মতোই অসীম ক্ষমতার অধিকারি। লক বললেন, না শাসকের ক্ষমতার সীমা থাকবে। অবশ্য শাসকের ক্ষমতার সীমার বিষয়টা পরে মতেস্কু আরো পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন করেছেন। তবে লক একটা নতুন কথা বলেছিলেন, সেটা হচ্ছে জনগণের রাইট টু রিভোল্ট। মানে শাসককে পছন্দ না হলে, শাসক জনগণের লাইফ, লিবার্টি ও প্রপার্টি রক্ষা করতে না পারলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অধিকারকে লক বললেন ন্যায়সঙ্গত। শাসকের বিরুদ্ধে জনগণের রাজনৈতিক লড়াইয়ের অধিকারের প্রশ্নটা জন লক প্রথম আনলেন।

এরপরে এলেন মতেস্কু। তিনি লকের প্রস্তাবিত শাসকের ক্ষমতার সীমার বিষয়ে স্পষ্ট প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন- শাসকের তিনটা স্বাধীন অংশ থাকবে এবং একে অন্যের কাজে হস্তক্ষেপ করবে না। একটা বিভাগ হবে আইন, একটা বিভাগ হবে বিচার ও আরেকটা বিভাগ হবে নির্বাহী বিভাগ। কোন বিভাগই এককভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠবে না।

এরপরে এলেন জা জাঁক রুশো। তিনি বললেন, রাষ্ট্র ও জনগণের যে সম্পর্ক ও ক্ষমতার যে যে ভারসাম্য, কে কতটুকু ক্ষমতার চর্চা করবে তা কাগজে কলমে স্পষ্ট হয়ে থাকতে হবে এবং সেটাই হচ্ছে একটা সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তি হবে রাষ্ট্র এবং জনগণের মধ্যে। এটাই আজকের দিনের সংবিধান।

এরপরে এলেন ভলতেয়ার, তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের নির্মাণের জন্য সেইসময়ে শেষ আঁচড় দিয়েছিলেন। সেটা হচ্ছে রাষ্ট্র আর চার্চকে আলাদা থাকতে হবে। রাষ্ট্রের চার্চের কাছে থেকে আর বৈধতা কিনতে হবে না। কারণ বৈধতা দিচ্ছে এখন জনগণ। এটাকেই বলে সেক্যুলার স্টেট।

অবশ্য স্যেকুলারিজমের জন্মের জন্য কিছু রাজনৈতিক কারণও ছিলো। তবে সকল রাজনৈতিক কারণ প্রথমে চিন্তার জগতে বয়ান বা ডিস্কোর্স হিসেবে হাজির থাকে। তাই সকল রাজনৈতিক ঘটনা কোন চিন্তা থেকে জন্ম নিয়েছে সেটার হদিস নেয়া জরুরী।

তো এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, সেক্যুলার স্টেটের জরুরত কেন ইউরোপের হয়েছিল। যেই ঐতিহাসিক কারণে ইউরোপের সেক্যুলার হওয়ার দরকার হয়েছিলো, সেই জরুরত কী আমাদের আছে? যদি সেই জরুরত না থাকে, তবে সেক্যুলারিজমের জন্য জান কোরবান করে দেয়ার কারণ কী হে বিজ্ঞজন?

লেখক: ইতিহাস গবেষক, সমালোচক এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় এক্টিভিস্ট।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.