Home ইতিহাস-ঐতিহ্য পলাশীর ঐতিহাসিক যুদ্ধ এবং মীর জাফর-ক্লাইভ গোপন চুক্তি

পলাশীর ঐতিহাসিক যুদ্ধ এবং মীর জাফর-ক্লাইভ গোপন চুক্তি

।। মুজিবুর রহমান মুজিব ।।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বৃহস্পতিবার বাংলা -বিহার -উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব, জাতীয় বীর, প্রজাবৎসল নৃপতি মির্জা মোহাম্মদ সিরাজুদ্দৌলা মনসূরুল মুলক শাহকুলি খান হায়বৎ জং বাহাদুর নদীয়া জেলাধীন ভাগিরথি নদীর তীরে পলাশীর যুদ্ধে সিপাহসালার মীর জাফর আলী খান এবং সেনাপতি রাজা রায়দূর্লভ ও এয়ার লুৎফে খানের প্রতারণা-ছলনা-ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতায় প্রায় বিনাযুদ্ধে পরাজয় বরণ করেন।

২৩ জুনের বিকালে পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ভগ্নহৃদয়ে তিনি পলাশী ত্যাগ করে শক্তি সঞ্চয় ও সৈন্য সংগ্রহের জন্য রাজধানী মুর্শিদাবাদ অভিমুখে যাত্রা করেন। দিনের শেষে পাটনা যাবার পথে মীর জাফরের জামাতা মীরন কর্তৃক গ্রেপ্তার হয়ে মুর্শিদাবাদ প্রেরিত হন। ২রা জুলাই নবাব সিরাজের পিতা-মাতার দয়া মায়ায় আশ্রিত-লালিত-পালিত পাষাণ মোহাম্মদী বেগের ছরিকাঘাতে শহীদ হন। ইংরেজদের সঙ্গে আঁতাত-আত্মসমর্পন করেননি, প্রাণ ভিক্ষা চাননি, বেঈমান মীর জাফর আলী খান চক্রের সঙ্গে আঁতাত করে তথাকথিত ঐক্যমতের সরকার গঠনে সম্মতি জ্ঞাপন করেননি স্বাধীন বাংলার স্বাধীনচেতা নবাব সিরাজুদ্দৌলা।

মুঘল ভারতে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা একইসুবার অধীনে ছিল। দিল্লীর নবাবি সনদপ্রাপ্ত সুবে বাংলার শাসকগণ দিল্লীর প্রতি নামমাত্র বশ্যতা স্বীকার এবং নামকাওয়াস্তে-খাজনা প্রদান করে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে শাসন ও রাজ্য পরিচালনা করতেন। বাংলার স্বাধীন নবাবদের মধ্যে নবাব আলীবর্দী খাঁ-ই-ছিলেন শক্তিশালী সৎ, ধর্মপ্রাণ ও প্রজাবৎসল নৃপতি। তিনি ভাস্কর পন্ডিতের রোষানল এবং কুখ্যত মারাঠাদস্যুদের আক্রমণ থেকে বাংলার কৃষক প্রজাকুলকে রক্ষা করে নিরাপদ জীবন উপহার দিয়েছিলেন।

নবাব আলীবর্দীর কোন পুত্র সন্তান ও উপযুক্ত উত্তরসূরী না থাকায় প্রিয় দৌহিত্র সিরাজুদ্দৌলাকে দত্তক নিয়ে তাকে দিবসে নীশিতে সঙ্গে রেখে যুদ্ধ পরিচালনা ও রাজ্য শাসন প্রসঙ্গে প্রকৃত ওস্তাদের মত প্রাসঙ্গিক পাট দিয়ে আসছিলেন। প্রিয় দৌহিত্রকেই তিনি যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে গড়ে তোলেন। প্রায় ১৬ বছর রাজ্য শাসনের পর ১৭৫৬ সালের ৯ এপ্রিল ৮২ বৎসর বয়সে নবাব আলীবর্দী খার মৃত্যু হলে অর্ধ সপ্তাহাধিক কাল জাতীয় শোক পালনের পর ঐ সালের ১৫ এপ্রিল যুবক সিরাজুদ্দৌলা নবাব মনসুরুল মুলকমির্জা মোহাম্মদ শাহকুলি খান সিরাজুদ্দৌলা হয়বত জং বাহাদুরনাম ও উপাধি ধারণ করে মাতামহের মসনদ আরোহণ করেন।

সিংহাসন আরোহণ করেই বাংলার নবীন নবাব সিরাজুদ্দৌলা ঘরে-বাইরে শত্রুতা ও ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন হলেন। মরহুম নবাব আলীবর্দীর বৈমাত্রীয় ভগ্নি শাহ খানমের স্বামী সিপাহসালার মীরজাফর আলী খান বরাবরই লোভী, অকৃতজ্ঞ, বেঈমান ও বিশ্বাসঘাতক। ইরাক থেকে ভাগ্যে উন্নয়নে বাংলায় আগত দরিদ্র সৈয়দ আহমদ নজফি’র পুত্র মীর জাফরকে শ’টাকা বেতনে জমাদারের চাকরি দিয়ে একটি দরিদ্র অথচ সম্ভ্রান্ত সৈয়দ পরিবারকে সাহায্য করেছিলেন মানবপ্রেমিক শাসক আলীবর্দী। ক্রমান্বয়ে নিয়োগ দিয়েছিলেন বাংলার প্রধান সিপাহ সালারের গুরুত্বপূর্ণ পদে।

বেঈমান মীর জাফর আলী খান আলীবর্দীর জীবদ্দশায়ই বাংলার মসনদের প্রতি বদনজর ছিল, ষড়যন্ত্র ও বিদ্রোহ করে বাংলার মসনদ দখলে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বৃদ্ধ নবাব আলীবর্দী মীর জাফরকে প্রধান বখশির পদ থেকে পদচ্যুত করলেও ক্ষমা ভিক্ষা ও স্বজনদের অনুরোধে ক্ষমা প্রদর্শনপূর্বক স্বপদে বহালের আদেশ দিয়েছিলেন। নতুন নবাবের নিযুক্তি ও দায়িত্ব গ্রহণে নারাজ-নাখোশ ছিলেন নিমকহারাম মীর জাফর আলী খান। মরহুম নবাবের ভগ্নিপতি হিসেবে তিনিও এই পদের দাবিদার ছিলেন। সেনাবাহিনীও স্বজনদেরকে নিয়ে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেন সিপাহসালার মীর জাফর আলী খান।

আরও পড়ুন- মুসলমানদের পিছিয়ে পড়ার কারণ এবং উত্তরণের উপায়

নবীন নবাবের আভ্যন্তরীণ শত্রুদের মধ্যে আপন খালা মেহেরুন্নেসা ওরফে ঘসেটি বেগম, আরেক খালাতো ভ্রাতা পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা শওকত জং। নবাবি পরিবার সদস্যদের বাহিরে রাজা রায় দূর্লভ, মহাতাব চাঁদ জগৎশেঠ, এয়ার লুৎফে খাঁ প্রমুখ স্বার্থপর ও অসৎ ব্যক্তিবর্গ মীর জাফর-জগৎশেটের নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলা ও বাংলার নবাবের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ষড়যন্ত্র করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে যোগাযোগ ও আঁতাত করেন, তাকে জানিয়ে দেন তারা নতুন নবাব দেখতে চান। এই চক্রের পছন্দের প্রার্থী হলেন বেঈমান সিপাহসালার মীর জাফর আলী খাঁন।

বাংলার নবীন নবাব সিরাজুদ্দৌলা ছিলেন প্রিয় দাদু মরহুম নবাব আলীবর্দীর আদলে-আদর্শে গড়া-স্বাধীন চেতা-বৃটিশ বিদ্বেষী-স্বাধীন শাসক। বাংলার নবাবির দায়িত্বভার তিনি ইরেজদের ঔদ্ধত্য খর্ব করার জন্য কোলকাতা অভিযান করেন। বিজয় অর্জন করে প্রিয় দাদুর নামে কোলকাতা নতুন নামাকরণ করেন আলীনগর। শাসক হিসেবে নবাব সিরাজুদ্দৌলা যখন কৃতিত্ব ও পারদর্শিতা প্রদর্শন করছিলেন তখন মীরজাফর-জগৎশেট-চক্র সিদ্ধান্ত নিলেন নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে আর সময় দেয়া যায় না, চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার এখনই সময়।

বাংলাদেশ আর্কাইভসের সহকারি পরিচালক-লেখক ফজলে আহমদ চৌধুরীর গবেষণা গ্রন্থ-“দলিলপত্রে পলাশীর যুদ্ধ”-তে বলা হয়েছে, মীর জাফর আলী খান ও ইংরেজদের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্রে-‘আমি আল্লাহ্্ ও আল্লাহর নবীর নামে শপথ করছি যে, যতক্ষণ পর্যন্ত জীবন আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এই সন্ধির শর্তাবলী মেনে চলব লেখা ছিল। (এই অংশটুকু মীর জাফর আলী খাঁন নিজ হাতে লেখেন।) এই সন্ধিটি এডমিরাল এবং কর্নেল ক্লাইভ (সাবুদ জং বাহাদুর) গভর্ণর ড্রেক মিঃ ওয়াট সের সঙ্গে সম্পাদিত। “ইন্ডিয়ান অথবা ইউরোপিয়ান যেই হোক, যারা ইংরেজের শত্রু, তারা আমারও শত্রু। ইংরেজদের নিকট আমি যখনই সাহায্য প্রার্থনা করব, তখন তাদের সকল ব্যয়ভার বহন করব। গঙ্গানদীর নিকটবর্তী হুগলিতে আমি কোন নতুন দূর্গ নির্মাণ করব না”।

এই গোপন চুক্তির ইংরেজী মাস তারিখ উল্লেখ না থাকলেও ১১৭০ হিজরি সনের ১৫ রমজান উল্লেখ আছে। তবে এটা স্থির নিশ্চিত চুক্তিটি ১৭৫৭ সালের ১৩ জুন পলাশীর যুদ্ধের পূর্বে হয়েছিল এবং এই গোপন বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইংরেজদের পছন্দ ও পেয়ারের লোক মাহতাব চাঁদ জগৎশেঠের বাড়িতে। গোপন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কোম্পানির প্রতিনিধি ওয়াটস, সেনাপতি রাজা-রাজ বল্লভ, সিপাহ- সালার মীরজাফর আলী খান প্রমুখ।

মীর জাফর-ক্লাইভের এই গোপন চুক্তি ছিল, বৃটিশ বেনিয়াদের কাছে বাংলার সিপাহসালারের নিঃশর্ত আত্মসমর্পন, শর্তহীন দাসখত। বাংলার স্বাধীনতা -সার্বভৌমত্বকে বৃটিশের পদতলে নিবেদন। আলোচনা ক্রমে সাব্যস্ত হয়েছিল বৃটিশের স্বার্থ বিরোধী সিরাজকে সিংহাসন থেকে হটিয়ে ইংরেজবান্ধব সিপাহসালার মীর জাফর আলী খানকে সিংহাসনে বসানো হবে এবং বৃটিশ বেনিয়া কোম্পানি এবং কোম্পানির দাসানুদাস মীর জাফর-রাজবল্লভ-জগৎশেঠ-চক্র মিলে মজাছে রাজ্য শাসন ও বাণিজ্য করবেন।

ইংরেজ-মীরজাফর গোপন চুক্তি এবং এই চক্রের গোপন আহ্বানে কোম্পানির কর্মকর্তা রবাট ক্লাইভ ১৭৫৭ সালের ১৩ জুন মাত্র এক হাজার বৃটিশ সৈন্য, দুই হাজার ভাড়াটে দেশী সিপাহী এবং ছোট বড় দশটি কামান নিয়ে বাংলার নবাবের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ ঘোষণা করে রাজধানী মুর্শিদাবাদ অভিমুখে রওয়ানা হন। উদ্দেশ্য রাজধানী মুর্শিদাবাদ দখল বাংলার নবাবকে বন্দি ও হত্যা করা এবং ক্লাইভের গর্দভ মীরজাফরকে বাংলার সিংহাসনে বসানো। ধূর্ত ক্লাইভ সসৈন্য ২২ জুন কোলকাতা থেকে প্রায় সত্তর মাইল দূরবর্তী নদীয়া জেলাধীন ভাগিরথি নদীর তীরে ঐতিহাসিক পলাশীর আম্রকাননে শিবির স্থাপন করেন। মাটির দেয়াল ঘেরা লক্ষ বৃক্ষের বাগান বলে এলাকার নাম লক্ষ বাগও।

সেকালে একালের মত তথ্য প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রচলন না থাকলেও গুপ্তচর প্রথা চালু ছিল। বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলা গুপ্তচর মারফত ইংরেজদের রাজধানী আক্রমণের সংবাদ পেয়েই সিদ্ধান্ত নিলেন ইংরেজদের সঙ্গে কোন আলোচনা, সন্ধি কিংবা কোন ঐক্যমতের সরকার নয়, যুদ্ধের বদলে যুদ্ধ, ইংরেজদের এই বেআদবী ও ঔদ্ধত্যের জবাব যুদ্ধের ময়দানেই দেবার জন্য যুদ্ধ যাত্রা শুরু করলেন।

প্রবীণ প্রত্নতত্ত্ববিদ সাবেক সচিব আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া রচিত সুবিশাল গবেষণা গ্রন্থ নবাব সিরাজুদ্দৌলা মীর ফজলে আহমদ চৌধুরী রচিত দলিল পত্রে পলাশীর যুদ্ধ, ভারতের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. অমলেন্দু দে রচিত-সিরাজের পুত্র ও বংশবরদের সন্ধানে-ইত্যাদি বহুবিধ গ্রন্থের তথ্য মতে নবাবের সৈন্য বাহিনীতে অশ্বারোহীসহ নিয়মিত সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা কমবেশি পঞ্চাশ হাজার, ছোট বড় পঞ্চাশটি কামান এবং নবাবের অনুগত ফরাসি সেনাপতি মঁসিয়েলা-এর শ’খানেক সৈন্য ও ছোট বড় পাঁচটি কামান ছিল।

এই বিশাল নবাব বাহিনীর বিরুদ্ধে সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে ক্লাইভের যুদ্ধ যাত্রায় সহজেই অনুমিত হয় এক্ষেত্রে নবাবের বেঈমান সিপাহসালার মীরজাফরের সবুজ সংকেত ছিল। না হয় ধূর্ত ক্লাইভ এত বুর্বক ও বেআক্কেল ছিল না যে, এই সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে অর্ধলক্ষ বাংলাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করবেন। ২২ জুন বিকেলেই বিশাল বাংলা বাহিনী নিয়ে নবাব সিরাজুদ্দৌলা ক্লাইভের শিবির থেকে প্রায় দেড় মাইল দূরে শিবির স্থাপন ও রাত্রি যাপন করেন।

২৩ জুন বৃহস্পতিবার ১৭৫৭ সাল। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে যুদ্ধের বাজনা বেজে উঠল। রবার্ট ক্লাইভ দুরবিন দিয়ে দেখলেন। বিশাল নবাব বাহিনী তাদেরকে তিন দিকে ঘিরে ফেলেছে কিন্তু ভয় পেলেন না রবার্ট ক্লাইভ-কারণ তার সঙ্গে গোপন চুক্তি এবং মৌখিক আলোচনা মোতাবেক নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান, সেনাপতি রাজা রাজ বল্লভ ও এয়ার লতিফ খাঁ (এই বেঈমানকে কোন কোন গ্রন্থে এয়ার লুৎফে খা বলা হয়েছে) এক বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে নবাব শিবিরের দূরবর্তী স্থানে অবস্থান নেন।

মোট সৈন্য বাহিনীর অর্ধেকাংশের অধিক সৈন্য নিয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়ে প্রধান সেনাপতি ইংরেজদেরকে জানান দিলেন তিনি নবাবি সৈন্য বাহনীর সঙ্গে নেই, এই যুদ্ধেও নেই। মীর জাফরকে ভরসা করেই এই অসমযুদ্ধের ঝুঁকি নিলেন রবার্ট ক্লাইভ। তবে নবাব শিবিরকে বেষ্টনি ও নিরাপত্তা দিয়ে রাখেন নবাবের অনুগত সেনাপতি মীর মদন। তার অধীনে ছিল পাঁচ হাজার অশ্বারোহী ও সাত হাজার পদাতিক সৈন্য। সঙ্গে নবাবের বিশ্বস্ত সেনাপতি রাজা মোহনলাল এবং নবাবের অনুগত ফরাসী সেনাপতি মঁসিয়েলা।

২৩ জুন সকাল আটটায় সেনাপতি মীর মদন এবং মঁসিয়েলার কামান দাগার মাধ্যমে ইতিহাস বিখ্যাত ঐতিহাসিক পলাশীর যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হল। বাংলা বাহিনীর কামানের গোলায় টিকতেই পারলেন না কোম্পানি সেনাগণ। বেশ কজন ইংরেজ সৈন্য নিহত হলেন। যুদ্ধের প্রথম ভাগ বাংলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। অসহায় রবার্ট ক্লাইভ সসৈন্যে পিছু হটতে বাধ্য হলেন। শত্রু সৈন্যদেরকে হটিয়ে বীরদর্পে এগিয়ে চলেন নবাব বাহিনী। অবস্থা বেগতিক দেখে রবার্ট ক্লাইভ নবাবের শিকার গৃহ এবং দেয়ালের নিম্নবর্তী স্থানে আশ্রয় নিলেন।

ইতিমধ্যে দুপুরের দিকে একপশলা বৃষ্টিতে ভিজে পলাশীর প্রান্তর কর্দমাক্ত হয়ে গেলে নবাবের গোলাবারুদ ত্রিপল দিয়ে ঢাকা ছিল না বলে বৃষ্টিতে ভিজে নবাবের সম্পূর্ণ গোলাবারুদ অকেজো হয়ে গেল। বৃষ্টি শেষে নবাব বাহিনী মনে করল বৃষ্টিতে ভিজে বৃটিশের গোলাবারুদ ও নিশ্চয় তাদের মত নষ্ট হয়ে গেছে, তাই সম্মুখ সমরের জন্য সেনাপতি মীর মদন এগিয়ে গেলেন। কিন্তু ধূর্ত ইংরেজ তাদের গোলাবারুদ ত্রিপল দিয়ে ঢেকে যথাযথ হেফাজত ও নিরাপদে রাখায় তাদের কোন গোলাবারুদই বিনষ্ট হয়নি। বৃটিশ সেনাদের কামানের গোলাবর্ষণে বিপুল সংখ্যক নবাব সৈন্য হতাহত ও নিহত হলেন।

সেনাপতি মোহনলাল এবং সেনাপতি বদরী আলী খাঁ আহত এবং নির্ভীক সৈনিক বাংলা প্রেমিক মীর মদন যুদ্ধের ময়দানে নিহত হলে নবাব বাহিনীর মধ্যে, বিশৃংখলা দেখা দেয়, পূর্বের মত অদূরে দাঁড়িয়ে ইংজেদের রননৈপুণ্য দেখে তৃপ্তির হাসি হাসছিলেন সিপাহসালার মীর জাফর আলী খান এবং তার সাঙ্গপাঙ্গ গণ। বাংলার ভাগ্যাহত নবাব সিরাজুদ্দৌলা মুষড়ে পড়লেন। কিং কর্তব্যবিমুড় হয়ে সিপাহসালার মীর জাফরকে তলব দিয়ে তার নবাবি পাগড়ি মীর জাফরের পায়ের কাছে রেখে বললেন-“It is for you to defend my honour-” পবিত্র কোরআন স্পর্শ করে কসম খেলেন সিপাহসালায় মীর জাফরবললেন আজ যুদ্ধের ময়দান থেকে সকল সৈন্য প্রত্যাহার করা হোক-কাল প্রত্যুষেই তিনি বৃটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন-।

ঔদ্ধত্যমূলকভাবে সিপাহ সালারের প্রস্থানে সন্দেহ হল নবাবের, ডেকে পাঠালেন সেনাপতি রায়দূর্লভকে। তিনিও বেআদবীর সঙ্গে অনুরূপ প্রস্তাব করে নবাব বাহাদুরকে মুর্শিদাবাদ ফিরে যেতে পরামর্শ দিলেন। যুদ্ধের ময়দানে সেনাপতির পরামর্শ মানাই নিয়ম। নবাব নিরুপায় হয়ে ময়দান থেকে নবাবী সৈন্য প্রত্যাহারের আদেশ জারি করলেন। এদিকে বেঈমান সিপাহসালার তার শিবিরে ফিরেই রবার্ট ক্লাইভকে পত্র লিখলেন,“সেনাপতি মীর মদন নিহত। নবাব ভীত। আর লুকিয়ে থাকার প্রয়োজন নেই, এখনই অথবা রাত তিনটায় নবাব শিবির আক্রমণ করুন কার্য সিদ্ধি হবে”।

ইতিপূর্বেকার গোপন চুক্তিপত্র, মীর মদনের মৃত্যু নবাব শিবিরের বিশৃংখলা এবং প্রিয়মিত্র মীর জাফর আলী খানের গোপন পত্র পেয়ে ভাগ্যবান রবার্ট ক্লাইভ ঝাঁপিয়ে পড়লেন নবাব শিবিরে। চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হল। পলাশীর ময়দানে বেজে উঠলো বিজয় দূন্দভী, বিজয় বাজনা, উড়ল বিজয় নিশান। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার চৌদ্দমাস আট দিনের শাসন শেষ হল। স্যার যদুনাথ সরকার বলেছেন-thus ended muslim rule in bengal, the foreign master of the sward had became its king maker|

পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়, পতন ও শাহদাত বরণে বাংলার প্রশাসন ও জনজীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। মীর জাফর আলী খান নতুন নবাব হয়ে কোম্পানির সঙ্গে ভাগ বাটোয়ারা ও লুণ্ঠনে মেতে উঠেন। ফলে ১৭৬৯-৭০ সালে-ছিয়াত্তরের মনন্থর নামেভয়াবহ দুর্ভিক্ষে বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যান। ইংরেজরা অতঃপর মারাঠা, ফরাসী ও মহীশুরের বীর টিপু সুলতানকে পরাজিত ও নিহত করে ভারতব্যাপী রাজ্য বিস্তার করতে থাকে।

পলাশীর একশত বছর পর ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লবে বৃটিশের বিজয়, দিল্লীর শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহের প্রহসনমূলক বিচার দেশান্তর এবং মৃত্যুর পর ভারতে মুঘল শাহীর অবসান হয়। ভারতব্যাপী ইংরেজ রাজত্ব জাকিয়ে বসে। পলাশীর বিয়োগান্তক ট্রেজেডির মহানায়ক বাংলার জাতীয় বীর শহীদ সিরাজুদ্দৌলার কোরবানী বিফলে যায়নি-৪৭ সালে বৃটিশ বিতাড়িত হয়ে উপমহাদেশ পাক-ভারত নামে দুটি স্বাধীন দেশের মর্যাদা লাভ করে।

পাকিস্তানের পঁচিশ বৎসর পর একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অভ্যুদয় হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পরিশোধ বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব, পলাশীর মহানায়ক, জাতীয় বীর শহীদ সিরাজুদ্দৌলার উজ্জ্বল স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।

লেখক: সিনিয়র এডভোকেট, হাইকোর্ট। সাবেক সভাপতি, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব। মুক্তিযোদ্ধা। কলামিস্ট।

‘আধুনিকতা’ কি তার প্রতিশ্রুতি পালন করেছে?