Home ইসলাম বিজ্ঞানের আলোকে রাসূলুল্লাহ (সা.)এর সুন্নাত

বিজ্ঞানের আলোকে রাসূলুল্লাহ (সা.)এর সুন্নাত

4

।। আলহাজ্ব সৈয়দ জহির উদ্দীন ।।

একদা পারস্য সম্রাট নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবা (রাযি.) আজমাইনদের খিদমতের জন্য রাজ পরিবারের এক বিজ্ঞ হেকীমকে  মদীনায় প্রেরণ করেন। উক্ত হেকীম মদীনায় দীর্ঘদিন অবস্থান করার পর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানালেন যে, আমাকে নিজ দেশে যেতে অনুমতি প্রদান করুন। কেননা যে কাজের জন্য আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে, আজ দীর্ঘদিন আমি মদীনায় অবস্থান করার পরও কোন লোককে অসুস্থ হতে দেখছি না। আর কেনই বা এরা অসুস্থ হয় না তাও বোধগম্য নয়। হেকীমের কথায় মানুষের পথের দিশারী পেয়ারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসলেন এবং হেকীমকে জানালেন যে, আমরা পরিপূর্ণ ক্ষুধা না লাগা পর্যন্ত খানা খাই না। আর ক্ষুধা থাকতে খানা থেকে ফারাগ হয়ে যাই। এটাই আমাদের রোগ থেকে  মুক্ত থাকার কারণ।

আল্লাহ পাক মানব দেহের জন্য তিন হাজার রোগ ব্যাধি সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে দুই হাজারটি রূহানী বা আত্মিক রোগ আর এক হাজারটি জাহেরী বা শারিরীক রোগ। রূহানী ব্যাধি সুন্নাতী আমল দ্বারা দর করা সম্ভব আর জাহেরী ব্যাধি নানা প্রকার ঔষধের মাধ্যমে দর করা সম্ভব। গবেষণা করে দেখা গেছে যে, মানব শরীরের প্রায় ৮০ ভাগ রোগ ব্যাধি পেট হতে সৃষ্ট। যে ব্যক্তি তার পেটকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে, সে প্রায় সব রকমের রোগ ব্যাধি হতে মুক্ত থাকতে সক্ষম হয়েছে।

আমাদের সমাজে একটি বিশ্বাস চালু আছে যে, মানুষ আহার না করলে মারা যায়। আসলে কি তাই? না কখনই না। বরং অধিক খেলে মানুষ মরে। বাস্তবতার নিরিখে পরীক্ষা করুন, অভিজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করুন, অতি ভোজনের কারণে প্রায় শতাধিক রোগের সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে আবার কতকগুলি আছে অতি মারাত্মক। মানুষকে সর্বশান্ত করে কবর পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়।

ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বহু মনীষি একাধারে চল্লিশ বৎসর খাদ্য গ্রহণ না করে রূহানী ফায়েযে জীবিত ছিলেন। স্বয়ং আল্লাহর নবী একটানা সাতদিন সাত রজনী খাদ্যবিহীন অবস্থায় জীবন যাপন করেছেন। আমাদের বাংলাদেশের মত বহু দরিদ্র রাষ্ট্রের অসংখ্য গরীব মানুষ ফুটপাতে, রেল স্টেশনে দিনের পর দিন না খেয়ে বেঁচে আছে। অথচ বড় লোকদের তুলনায় তাদের রোগ ব্যাধিও নিতান্ত কম।

উম্মতের পথ প্রদর্শক দু’জাহানের নেতা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলিয়াতে যিন্দেগী আজকের বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেছে যে, তাঁর প্রতিটি কর্মই মানব কল্যাণমূখী এক একটি বিজ্ঞান। অসংখ্য সুন্নাতের মধ্যে আমরা এখানে কতক সুন্নাতকে বিজ্ঞানের মাপকাঠিতে আলোচনা করব।

যেমন আহারের বেলায় প্রথমে হাত ধৌত করে খাওয়া, ধীরে ধীরে খাওয়া, ছোট ছোট লোকমায় খাওয়া, চিবিয়ে চিবিয়ে খাওয়া, খাওয়ার সময় অধিক কথাবার্তা না বলা, হাত ও প্লেট ভাল করে চেটে খাওয়া, তিন তরিকার এক তরিকায় বসা (১) দুই হাঁটু খাড়া করে বসা (২) এক হাঁটু খাড়া এবং এক হাঁটু বিছিয়ে বসা (৩) দুই হাঁটু বিছিয়ে বসা।

এই সুন্নাতগুলির ক্ষেত্রে বিজ্ঞান আমাদেরকে শিক্ষা দিচ্ছে- হাত ধুয়ে খানা খাওয়া সভ্যতার নিদর্শন। বন্য পশু-পাখী এরা অসভ্য তাই এদের পরিস্কার পরিচ্ছন্নের বালাই নাই। মানুষ সভ্য তাই এদের পরিস্কার পরিচ্ছন্নের দিকটা খেয়াল রাখতে হয়। আর এটা স্বাস্থ্য সম্মত। এতে নানা প্রকার রোগ জীবাণু হতে মুক্তি পাওয়া যায়। আস্তে আস্তে খাওয়া, ছোট ছোট গ্রাসে খাওয়া, উত্তমরূপে চর্বন করে খাওয়া, এগুলি পরিপূর্ণ বিজ্ঞান।

আস্তে আস্তে খাওয়া একটি সভ্যতার নিদর্শন। ক্ষুধার্ত হিংস্র জানোয়ারেরা খেতে তাড়াহুড়া করে। তাছাড়া তাড়াহুড়া করে খেতে গেলে অনেক সময় শ্বাস নালীতে খাদ্য প্রবেশ করতে পারে। ফলে মানুষের সাময়িক কষ্ট বাড়ে। ছোট ছোট লোকমায় এবং উত্তমরূপে চর্বন করে খেলে খাদ্যে অধিক ভিটামিন পাওয়া যায়। খাদ্য স্বাদ লাগে এবং ইহা হযমী শক্তির সহায়ক হয়।

খাওয়ার সময় অধিক কথা বলার কারণে প্রায় সময় খাদ্য শ্বাস নালীতে প্রবেশ করে ব্যক্তির কষ্ট বাড়ে এবং লাঞ্চে তা নানা প্রকার ব্যাধি সৃষ্টি করতে পারে। আঙ্গুল এবং প্লেট চেটে খাওয়া একটি সুন্নাত। এতে সমস্ত খাদ্যে যে স্বাদ পাওয়া না যায়, তার চেয়ে অধিক স্বাদ ও তৃপ্তি লাভ হয়। খাদ্যের ভিটামিনগুলি কিছুটা তৈলাক্ত এবং ভারী তাই ইহা সর্বদাই কিছুটা আঙ্গুলে লেগে যায় বাকীটা প্লেটের তলায় পড়ে থাকে। চেটে খাওয়ার মাধ্যমে তা শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিনের চাহিদা মেটায়।

খাদ্য দ্রব্য ডান হাতে খাওয়া সুন্নাত।

হাত দ্বারা খাওয়া কত মজা। গোস্তের হাড়, কাঁটাযুক্ত মাছ কত মজা করে খাওয়া যায়। কিন্তু কাঁটা চামুচের অধিকারীরা এতে কত অসহায়, একবার ভেবে দেখুন।

তিন তরীকার এক তরীকায় বসা। আজকাল অনেকে চেয়ার টেবিলে বসে খায়, অথবা মাদুরে দুই হাঁটু দুই পার্শ্বে ছড়িয়ে এক পা আরেক পায়ের উপর বিছিয়ে জামাই আসনে বসে খানা খায়। এতে অতি সহজে পেট বেড়ে যায় এবং অধিক খাদ্যাহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেক সময় এ্যাপেন্টিসাইটিস এর ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠে। ২৪ ঘন্টার মধ্যে অপারেশন না করলে তা ফেটে গিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলেও পড়তে পারে। কিন্তু তরীকা মত বসে খেলে পেট বাড়ার বা অধিক খাদ্য গ্রহণের কোন সুযোগ থাকে না। উরুর চাপে এ্যাপেন্টির মুখ বন্ধ থাকে। ফলে খাদ্য কণা তার মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। এতে সকল সমস্যার ল্যাটা চুকে যায়।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- আহারের সময় পেটকে চার ভাগে ভাগ কর। একভাগ খাদ্য এবং দুই ভাগ পানি দ্বারা পূর্ণ কর, আর অন্যভাগ খালি রাখ। কত সুন্দর বিজ্ঞান সম্মত কথা। যা ১৪শত বছর পরে বিজ্ঞানীরা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। কারণ- মানব দেহের শারীরিক উপাদানে পানির অংশই বেশী। তাই স্বস্থ্যরক্ষার জন্যে খাদ্য অপেক্ষা পানির প্রয়োজন অধিক। কম খাদ্য সুস্বাস্থ্যের উপযোগী। এতে দেহ ও মন উভয় সুস্থ্য থাকে। পানি দ্বিগুণ গ্রহণের ফলে পাকস্থলীতে ডায়াগনষ্টি করতে সহজ হয়। কিডনীর সকল প্রকার রোগ হতে মুক্তি পাওয়া যায়। প্রস্রাবের মাধ্যমে দেহের বহু রোগ জীবাণু নির্গত হয়। আর একভাগ খালি থাকার কারণে শ্বাস-প্রশ্বাস চালাতে সহজ হয়। দেহে রক্ত সঞ্চালন সহজতর হয়।

রাতের বেলায় কিছু না খেয়ে শোয়া ঠিক নয়। সামান্য কিছু হলেও খেয়ে ঘুমানো উচিৎ। রাত্রে পানাহার না করলে শরীরের ওজন কমে। মনেও এর প্রভাব পড়ে। শরীর ও মন উভয় ভারী হয়ে গেলে অকালে বার্ধক্য আসে। আর এগুলি চিকিৎসা বিজ্ঞান কর্তৃক স্বীকৃত, যা আমরা অনেকেই অবগত আছি। মেদযুক্ত মোটা ভূড়িওয়ালা লোককে চিকিৎসকরা প্রায়ই পানাহার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দান করতে দেখি।

পানি পাত্রে শ্বাস-প্রশ্বাস না ফেলা এবং অধিক গরম খাদ্য আহার না করা, খাদ্যে ফুঁ না দেয়া ইহা সুন্নাতী রীতি। আর সুন্নাত মানেই কল্যাণ। আজ হাজার বছর পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই কথাকে বিজ্ঞান স্বীকার দিয়ে প্রকাশ করছে যে, মানুষ শ্বাস গ্রহণের সময় অক্সিজেন গ্রহণ করে, আর শ্বাস ছাড়ার সময় কার্বন-ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। এটি একটি বিষাক্ত গ্যাস, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এটি অক্সিজেন অপেক্ষা ভারী। পানিতে শ্বাস ফেললে কিংবা গরম খাদ্য-পানীয়তে শ্বাস ত্যাগ করলে তাতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিশে যায় এবং তা পুনরায় শরীরে প্রবেশ করে। ফলে স্বাস্থ্যহানি এবং কতক ব্যধিতে মানুষ আক্রান্ত হয়। তাছাড়া শ্বাস ত্যাগের সময় দেহ থেকে নানা প্রকার রোগ জীবাণু নির্গত হয়। ইহা খাদ্যের সাহায্যে পুনরায় দেহে প্রবেশ করে বংশ বিস্তার লাভ করে। আর এক পর্যায়ে মানুষ অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। [পরের কিস্তিতে সমাপ্য]

লেখক: প্রকাশক- উম্মাহ ২৪ ডটকম, সিইও- এম.জেড. ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরস এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক- আল-বাশার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, পুরানা পল্টন, ঢাকা।

পরবর্তী কিস্তি ‘বিজ্ঞানের আলোকে রাসূলুল্লাহর (সা.) সুন্নাত-২’ পড়তে এই লেখার উপর আলতো চাপ দিন

আরও পড়ুন- ‘দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির জন্য ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই’

4 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.