Home ফিকহ ও মাসায়েল মাযহাব মানা আপরিহার্য কেন?

মাযহাব মানা আপরিহার্য কেন?

0

।। মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস ।।

ইসলামী ফিকাহ্ শাস্ত্রের পরিভাষায় ইজতিহাদ অর্থ কুরআন ও সুন্নায় যে সকল আহ্কাম ও বিধান প্রচ্ছন্ন (অস্পষ্ট) রয়েছে সেগুলো চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে আহরণ করা। যিনি এটা করেন তিনি হলেন মুজতাহিদ। মুজতাহিদ কুরআন ও সুন্নাহ্ থেকে যেসকল আহকাম ও বিধান আহরণ করেন সেগুলোই হলো মাযহাব। যাদের কুরআন ও সুন্নাহ থেকে চিন্তা গবেষণার মাধ্যমে আহ্কাম ও বিধান আহরণের যোগ্যতা নেই তাদের কাজ হল মুজতাহিদের আহরিত আহ্কাম অনুসরণের মাধ্যমে শরীয়তের উপর আমল করা। এটাই হলো তাকলীদ, যারা তাকলীদ করে তারা হলো মুকাল্লিদ।

কুরআনে বা হাদীসে কোন বিধান প্রত্যক্ষভাবে না পেলে ইজতিহাদের মাধ্যমে শরীয়তের বিধান আহরণ করার এবং সে মোতাবেক আমল করার নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়ে গেছেন যার স্পষ্ট প্রমাণ হযরত মুআয বিন জাবালের হাদীস। বাস্তব কথা হল, ইজতিহাদের যোগ্যতা সকলের নেই। অথচ কুরআন ও হাদীস তথা শরীয়তের উপর আমল করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। সুতরাং যাদেরকে আল্লাহ্ পাক ইজতিহাদের যোগ্যতা দান করেছেন তারা ইজতিহাদের মাধ্যমে আর যাদের সে যোগ্যতা নেই তারা তাকলীদের মাধ্যমে কুরআন হাদীস তথা শরীয়তের উপর আমল করবে এটাই শরীয়তের বিধান।

বস্তুত তাকলীদ ও ইজতিহাদ হচ্ছে শরীয়তের দুই ডানা, কোনটি বাদ দিয়ে শরীয়তের উপর চলা সম্ভব নয়। তাই সাহাবায়ে কিরামের যুগ থেকেই চলে আসছে এই তাকলীদ ও ইজতিহাদ। এখন প্রশ্ন হতে পারে কুরআন যেখানে এক, হাদীস এক সেখানে বিভিন্ন মাযহাব কেন হলো? এ প্রশ্নের জবাব এই যে, আমাদের মন যা চায় সেটা শরীয়ত নয়, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল যা চান সেটাই হল শরীয়ত। আর ইমামদের ইজতিহাদের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের ইচ্ছাতেই হয়েছে এবং এতেই উম্মতের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। কেননা কুরআন ও হাদীসে মৌলিক বিষয়গুলো যেমন তাওহীদ, রিসালত, হাশর-নশর, পাঁচ ওয়াক্ত নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ফরয হওয়া প্রত্যক্ষ ও সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাই সেখানে ইমামদের কোন মতপার্থক্যও নেই। পক্ষান্তরে অমৌল বিষয়গুলো পরোক্ষ ও প্রচ্ছন্নভাবে বর্ণনা করে আলেমদের ইজতিহাদের উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ফলে ইজতিহাদের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে।

এই মতপার্থক্য আল্লাহ্ ও রাসূলের ইচ্ছা না হলে সকল বিষয় অবশ্যই প্রত্যক্ষ ও সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হতো। ইজতিহাদের ক্ষেত্রে তথা কুরআন ও সুন্নাহ্ অভিন্ন হলেও যেহেতু ইজতিহাদকারী মস্তিষ্ক ভিন্ন সেহেতু ইজতিহাদের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য হওয়া একান্ত স্বাভাবিক। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কিরামের মাঝে ইজতিহাদের মতপার্থক্য হয়েছে এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন পক্ষকেই দোষারোপ করেননি, বনু কুরাইযা (রাযি.)-এর হাদীস তার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

তাকলীদ দুই প্রকার (১) মুক্ত তাকলীদ (২) ব্যক্তি তাকলীদ। শরীয়তের পরিভাষায় সকল বিষয়ে নির্দিষ্ট মুজতাহিদের পরিবর্তে বিভিন্ন মুজতাহিদের সিদ্ধান্ত অনুসরণের নাম তাকলীদে মতলক বা মুক্ত তাকলীদ। পক্ষান্তরে সকল বিষয়ে নির্দিষ্ট মুজতাহিদের সিদ্ধান্ত অনুসরণের নাম তাকলীদে শাখছী বা ব্যক্তি তাকলীদ। তাকলীদ বা মাযহাবের অপরিহার্যতা সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহ্ থেকে কিছু অকাট্য প্রমাণাদী নিুে পেশ করা গেল।

কুরআনের আলোকে প্রথম প্রমাণঃ

কুরআনে আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন, “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর ইতায়াত- আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য করো, আর তোমাদের মধ্যে যারা “উলিল আমর” তাদেরও (ইতায়াত কর)।” (সূরা নিসাঃ ৫৯)।

প্রায় সকল তাফসীরকারের মতে আলোচ্য আয়াতের উলিল আমর শব্দটি দ্বারা কুরআন সুন্নাহর ইলমের অধিকারী ফকীহ ও মুজতাহিদগণকেই বুঝানো হয়েছে। এ মতের স্বপক্ষে রয়েছেন হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ্ (রাযি.), হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন আব্বাস (রাযি.), হযরত মুজাহিদ (রাযি.), হযরত আতা বিন আবিরাবাহ (রাযি.), হযরত আতা বিন ছাইব (রাযি.), হযরত হাসান বসরী (রাহ্.) প্রমুখ। তাছাড়া আরো অনেক জগদ্বরেণ্য তাফসীরকার  যেমন আল্লামা ইমাম রাযিও এর সমর্থনে বিভিন্ন সারগর্ভ যুক্তিপ্রমাণ পেশ করেছেন।

সর্বশেষে বলেছেন বস্তুতঃ আলোচ্য আয়াতে উলিল আমর ও উলামা শব্দ দু’টি সমার্থক। ইমাম আবু বকর জাস্সাসের মতে উলিল আমর শব্দটিকে বিস্তৃত অর্থে ধরে নিলে উভয় তাফ্সীরের মাঝে মূলতঃ কোন বিরোধ থাকেনা। কেননা তখন আয়াতের মর্ম দাঁড়াবে রাজনীতি ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে তোমরা প্রশাসকবর্গের এবং আহকাম ও মাসায়েলের ক্ষেত্রে আলেমগণের ইতায়াত বা অনুসরণ করো।

মোটকথা আলোচ্য আয়াতের আলোকে আল্লাহ্ ও রাসূলের অনুসরণ যেমন ফরয তেমনি কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যাদাতা হিসেবে আলেম ও মুজতাহিদগণেরও ইতায়াত বা অনুসরণ ফরয। আর এরই পারিভাষিক নাম হল তাকলীদ। উল্লিখিত আয়াতের শেষ অংশে বলা হয়েছে “হে ঈমানদানগণ! কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে তোমরা তা আল্লাহ্ ও তার রাসূল সমীপেই পেশ করো, যদি আল্লাহ্ এবং আখেরাতের উপর তোমরা ঈমান এনে থাকো।”

উক্ত আয়াতের প্রথমাংশে সর্বসাধারণকে এবং শেষাংশে মুজতাহিদগণকে সম্বোধন করা হয়েছে। এ উক্তিটি আল্লামা আবু বকর জাস্সাস স্বীয় আহকামুল কুরআন গ্রন্থে এবং আহলে হাদীস পন্ডিত আল্লামা নওয়াব সিদ্দীক খান ফতহুল বয়ান গ্রন্থে স্বীকার করেছেন।

মোটকথা আলোচ্য আয়াতের প্রথমাংশের নির্দেশমতে সাধারণ লোকেরা উলিল আমর তথা মুজতাহিদগণের বাতানো মাসায়েল মোতাবেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহ্ ও রাসূলের অনুসরণ করবে। পক্ষান্তরে আয়াতের শেষাংশের নির্দেশ মতে মুজতাহিদগণ তাদের ইজতিহাদ প্রয়োগের মাধ্যমে কুরআন সুন্নাহ থেকে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

সুতরাং ইজতিহাদের যোগ্যতা বঞ্চিত লোকেরাও বিরোধপর্ণ বিষয়ে কুরআন হাদীস চুষে নিজেরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তির কোন অবকাশ আলোচ্য আয়াতে নেই।

দ্বিতীয় প্রমাণঃ আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন, “তাদের (সাধারণ মুসলমানদের) কাছে শাšি ও শংকা সংক্রান্ত কোন খবর এসে পৌঁছলে তারা তার প্রচারে লেগে যায়, অথচ বষয়টি যদি তারা রাসূল এবং উলিল আমরগণের কাছে পেশ করতো তাহলে ইস্তিম্বাত ও সুক্ষ্ম বিচার শক্তির অধিকারী ব্যক্তিগণ বিষয়টি (রাসূল রহস্য) উদঘাটন করতে পারতো।” (সূরা নিসাঃ ৮৩)। আয়াতের তাফ্সীর প্রসঙ্গে আল্লামা ইমাম রাযি লিখেছেন “সুতরাং প্রমাণিত হলো যে ইস্তিম্বাত ও ইজতিহাদ শরীয়তের স্বীকৃত একটি হুজ্জত বা দলীল। আর কিয়াসের প্রক্রিয়াটি ইজতিহাদের সমার্থক কিংবা অন্তর্ভুক্ত বিধায় সেটাও শরীয়ত স্বীকৃত হুজ্জত।

মোটকথা এ আয়াত থেকে তিনটি বিষয় স্থির হল। প্রথমতঃ কুরআন-সুন্নাহ্র প্রত্যক্ষ নির্দেশের অবর্তমানে ইজতিহাদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দ্বিতীয়তঃ ইজতিহাদ ও ইস্তিম্বাত শরীয়ত স্বীকৃত হুজ্জত। তৃতীয়তঃ উদ্ভুত সমস্যা ও মাসায়েলের ক্ষেত্রে সাধারণ লোকের পক্ষে আলেমগণের তাকলীদ করা অপরিহার্য।

তৃতীয় প্রমাণঃ ধর্মজ্ঞান অর্জনের জন্য প্রত্যেকদল থেকে একটি উপদল কেন বেরিয়ে পড়েনা যেন ফিরে এসে স্বজাতিকে তারা সতর্ক করতে পারে? (সূরা তাওবাঃ ১২২)। আয়াতের মূল বক্তব্য অনুযায়ী উম্মাহর মধ্যে এমন একটি দল বিদ্যমান থাকা একান্তই জরুরী যারা দিনরাত কুরআন সুন্নাহর ইল্ম অর্জনে নিমগ্ন থাকবে এবং ইল্ম অর্জনের সুযোগ বঞ্চিত মুসলমানদেরকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান দান করবে। আরো পরিস্কার ভাষায় একটি নির্বাচিত জামাআতের প্রতি নির্দেশ হলো কুরআন সুন্নাহর পরিপর্ণ জ্ঞান অর্জন ও বিতরণের এবং সর্বসাধারণের প্রতি নির্দেশ হলো তাঁদের প্রদর্শিত পথ অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহর নাফরমানী থেকে বেঁচে থাকার। এটাই তাকলীদ। আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে ইমাম আবু বকর জাস্সাস (রাহ্.) লিখেছেন যে, এ আয়াতে আল্লাহ্ পাক আলেমগণকে সতর্ক করার এবং সর্বসাধারণকে সে সতর্কবাণী মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। [পরবর্তী কিস্তিতে সমাপ্য]

লেখক: প্রিন্সিপাল- জামিয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলূম নলজুরী, সিলেট, উপদেষ্টা- উম্মাহ ২৪ডটকম এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মেসার্স আব্দুল মজিদ এন্ড সন্স, তামাবিল, সিলেট।

আরও পড়ুন- সন্ত্রাস দমনে রাসূলুল্লাহ (সা.)এর তাৎপর্যময় ভূমিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.