Home ওপেনিয়ন জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে ভ্রাতৃপ্রতিম বিশ্ব গড়ার চেয়ে হিংসাবিদ্বেষের বীজ অনেক বেশি ...

জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে ভ্রাতৃপ্রতিম বিশ্ব গড়ার চেয়ে হিংসাবিদ্বেষের বীজ অনেক বেশি রোপিত হচ্ছে

0

।। জসিম উদ্দিন ।।

জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪তম বার্ষিক অধিবেশন শেষ হলো। পথচলার দীর্ঘ সময়ে বিশ্ব সংস্থাটি এ গ্রহের মানব জাতির জন্য কতটুকু করতে পেরেছে, আসলে কতটুকুই বা করার সামর্থ্য রাখে, সেই মূল্যায়ন হওয়া জরুরি। আমরা দেখতে পাচ্ছি বিশ্বনেতাদের নিরন্তর বাগাড়ম্বর। সবাই নিজের অবস্থানকে সঠিক ‘প্রমাণ’ করার জন্য জোরালো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। একই বিষয়ে এই নেতাদের বক্তব্য কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হতেও দেখা যাচ্ছে। তাহলে এই নেতারা সঠিক কথা বলছেন না। অন্য দিকে, প্রতি বছর সমস্যা-সঙ্কট, দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত ও যুদ্ধের সংখ্যাও বাড়ছে দেশে দেশে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের সমাধানের বদলে তা আরো জটিল আকার ধারণ করছে। অর্থাৎ জাতিসঙ্ঘ একটি সক্ষম প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব পালন করতে পারেনি।

উদাহরণ হিসেবে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সঙ্কটের কথা বলা যায়। সর্বশেষ, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা নিপীড়নের ব্যাপারটি মানবতার একটি বড় বিপর্যয়। এর আগেও ধারাবাহিকভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মুছে ফেলার কার্যক্রম মিয়ানমার চালিয়ে এসেছে। স্পষ্টত এটা মানবতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ। ২০১৭ সালে সভ্য বিশ্বের সামনে প্রকাশ্যে জাতি নিধনের জঘন্য কাজটি মিয়ানমার আবার চালায়। এই জাতিগোষ্ঠীকে গণহত্যা চালিয়ে প্রায় উৎখাত করে ফেলেছে। মাত্র কয়েক লাখ রোহিঙ্গা এখন মিয়ানমারে অবস্থান করলেও তাদের নাগরিক মর্যাদাটুকুও নেই। তারা বন্দিশিবিরে মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। মিয়ানমার সরকার ও দেশটির সেনাবাহিনী সংখ্যাগুরু রাখাইন তথা বৌদ্ধদের নিয়ে পরিকল্পিত উপায়ে কাজটি করেছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর প্রমাণ জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশনসহ নিরপেক্ষ সংস্থাগুলোর কাছে পর্যাপ্ত।

দেশটির সেনাবাহিনীর কিছু ইউনিট গণহত্যা-ধর্ষণসহ অমানবিক নিষ্ঠুরতা চালিয়েছে; প্রতিবেদনে তা সুনির্দিষ্টভাবে এসেছে। একটি রাষ্ট্র স্বেচ্ছায় পরিকল্পিত উপায়ে এত জঘন্য কাজটি যে করেছে, সে ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার হওয়ার কোনো সুযোগ পর্যন্ত জাতিসঙ্ঘ সৃষ্টি করতে পারেনি। উৎখাত হয়ে যাওয়া ১১ লাখের বেশি মানুষের নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার পন্থাও তারা তৈরি করতে পারেনি। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে জাতিসঙ্ঘ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ।

জাতিসঙ্ঘ এমন একটি সংস্থা বা সংগঠন, যারা নিজেরা অন্যদের ওপর প্রতিনিয়ত নির্ভরশীল। প্রকৃতপক্ষে সঙ্ঘবদ্ধ সংগঠন হিসেবে একটি ছোট দেশ যেভাবে তার এখতিয়ার প্রয়োগ করে, সেটাও জাতিসঙ্ঘের নেই। মাত্র কয়েকটি দেশ এর নামে চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রয়োগের ‘এখতিয়ার’ রাখে। ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে শক্তিশালী দেশগুলোকে আবার ঐকমত্যে পৌঁছাতে হয়। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে ‘ঐকমত্য’। বাস্তবে রাষ্ট্রগুলো পৃথিবী নামক এই গ্রহের সবচেয়ে বড় সঙ্কট মোকাবেলায় ঐক্য প্রদর্শন করে না। রোহিঙ্গা নামক জাতিটিকে বিশ্ববাসীর সামনে মিয়ানমার নির্মূল করে দিচ্ছে। এটা একটা ভয়াবহ অন্যায়, তা কারো বুঝতে অসুবিধা হয় না।

জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন ও ফ্রান্স। প্রতিটি দেশ সভ্য; মানবাধিকার কাকে বলে তাদের সবাই জানে। কিন্তু যখনই রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবতার পক্ষে অবস্থান নেয়ার প্রসঙ্গ আসে, চীন ও রাশিয়া নগ্নভাবে এর বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে অন্যায়ভাবে উৎখাত করে দেয়াকে তারা এর মাধ্যমে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে। ফলে এই জাতিগোষ্ঠীর জন্য আর কোনো উপায় অবলম্বন থাকছে না। কারণ, দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকাকে সমর্থন করে না। প্রতিবেশী ভারত ও চীন এবং অন্যান্য দেশও রোহিঙ্গাদের উৎখাত হয়ে যাওয়ার মধ্যে নিজেদের কোনো স্বার্থহানি দেখে না।

মিয়ানমারে অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ রয়েছে রাশিয়া ও চীনের। রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী বেঁচে থাকল কি মরে গেল, ওদের কাছে তার চেয়ে বড় হলো, দেশগুলোর নিজেদের অর্থনৈতিক-সামরিক স্বার্থ। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে মানবতার রক্ষক হতে চায়নি। ইরাকের বিরুদ্ধে কাল্পনিক অভিযোগ এনে যখন হামলা করা হলো ২০০৩ সালে তখন তিনটি দেশ এক জোট হয়েছিল। ওই যুদ্ধে ইরাকের তৎকালীন শাসক সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে মানববিধ্বংসী অস্ত্র থাকার যে অভিযোগ আনা হয়েছিল, সেটি পরে ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। ইরাক যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। মানবসভ্যতার অন্যতম নিদর্শন ইরাক নামের পুরো দেশটিতে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।

দীর্ঘকাল বঞ্চিত হয়ে আসছে ফিলিস্তিনি জনগণ। তারা নিজেদের বাসগৃহ থেকে উচ্ছেদ হয়েছে বিগত ছয় দশকের বেশি সময় ধরে। এ পুরো সময়ে জাতিসঙ্ঘ নিপীড়িত ফিলিস্তিনিদের পক্ষে অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে। নিপীড়ক ইসরাইল এ দীর্ঘ সময়ে কখনো সামান্য চাপের মুখে পড়েছে, এমন দেখা যায়নি। তাদের অপশক্তি উত্তরোত্তর বেড়ে এখন তারাও এক পরাশক্তি। একতরফাভাবে তারা নিজেদের রাষ্ট্রীয় সীমানা বাড়িয়ে নিচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি, জমি-জিরাত কেড়ে নিয়ে ইসরাইলি ইহুদিরা সেগুলো ‘নিজেদের সম্পত্তি’ বানিয়ে নিচ্ছে। কেবল ধর্মীয় পরিচিতির কারণে ফিলিস্তিনিরা নির্যাতিত হয়ে আসছে। এ ধরনের আরো নিপীড়নের ঘটনা বিশ্বে ঘটে চলেছে প্রকাশ্যে। পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাত ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ইরাকের পর সিরিয়া, তারপর আমরা দেখলাম বিধ্বস্ত হচ্ছে ইয়েমেন। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের আর বেশি দেশ অবশিষ্ট নেই। অথচ সঙ্কট সমাধানের কোনো লক্ষণ আজো সেখানে নেই।

ইন্দোনেশিয়ায় ক্ষুদ্র পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতার দাবি ওঠার পর খুব বেশি দিন লাগেনি, জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে দেশটিকে স্বাধীন করে দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ত্বরিত প্রচেষ্টা সেখানে দারুণভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। স্বাধীনতা প্রাপ্ত ক্ষুদ্র দেশটির জনসাধারণের সংখ্যাগরিষ্ঠই খ্রিষ্টান। অন্য দিকে যে দেশটি থেকে তারা স্বাধীনতা লাভ করেছে, তার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান। সঙ্কটের মধ্যে থাকা চীনের উইঘুর মুসলিম, ফিলিপাইনের মরো মুসলিমদের ব্যাপারে কোথাও কোনো উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায় না। তাহলে বলা যায়, ধর্মীয় কারণে সৃষ্ট গোলযোগে জাতিসঙ্ঘ কোথাও ত্বরিত সমাধান দিতে পারছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, জাতিসঙ্ঘকে ধর্মীয় কারণেও ব্যবহার করা হচ্ছে মহলবিশেষের স্বার্থে।

রোহিঙ্গা সঙ্কটের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় কাশ্মিরে নেমে এসেছে নতুন করে মারাত্মক পীড়ন। প্রায় দুই মাস ধরে কাশ্মিরের ৮০ লাখ মানুষকে যেন ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। ওই অঞ্চলের জনজীবন সন্ত্রস্ত ও স্তব্ধ হয়ে আছে। জাতিসঙ্ঘে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণ থেকে বোঝার উপায় নেই, তাদের কোনো সমস্যা রয়েছে। এ নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান জাতিসঙ্ঘে জোরালো ভাষণ দিয়েছেন। কিন্তু বিশ্বসম্প্রদায়ের মনোভাব এ ব্যাপারে শীতল। ইমরান খান ভাষণে উল্লেখ করেছেন, ১২০ কোটি মানুষের বাজার ভারত।

সবাই এ ব্যাপারটিকে বড় করে দেখছে। প্রভাবশালী দেশগুলোর কাছে অর্থনৈতিক লাভালাভ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় মানবতা আজ নিপাত যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় আগে থেকে ধর্মীয় বিভাজনের শিকার হচ্ছে সংখ্যালঘুরা। কাশ্মিরিদের স্বাধীনতার দাবি প্রায় সাত দশকের। সেখানে স্বাধীনতা আন্দোলন দমাতে ভারতের নিপীড়ন নির্যাতনের কথা সবাই জানে। সেখানে স্বাধীনতার দাবিদার মূলত মুসলমানেরা। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য কাশ্মিরে গণভোট আয়োজনের জরুরি প্রসঙ্গটি এখন আর আলোচনায় পর্যন্ত নেই।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ৭০ বছর পর ভারত শুরু করেছে ‘নাগরিকত্ব যাচাই।’ বাংলাদেশের পাশের আসামে ১৯ লাখ মানুষ ‘অনাগরিক’ ঘোষিত হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার সারা ভারতে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করার উদ্যোগের কথা বলছে। পুরো ভারতে আরো কত মানুষ নাগরিকত্ব হারাবে, তা এখনো বলা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গা সঙ্কট যখন চরম আকার ধারণ করছে, ভারত তখন এ ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালাচ্ছে। এ অভিযানের মূল স্পিরিট ধর্মীয় পরিচয় থেকে নেয়া হয়েছে। বুঝতে কারো বাকি নেই যে, দেশটির সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়কে টার্গেট করেই কথিত নাগরিকপঞ্জি করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যারা নাগরিকত্ব হারাচ্ছেন তারা কোন গ্রহের মানুষ?

তাদের ব্যাপারে কারো কি দায়দায়িত্ব নেই? অদূর ভবিষ্যতে অবস্থার যে ক্রমাবনতি হবে, দেশটির ক্ষমতাসীন নেতাদের মারমুখী বক্তব্য থেকে তা স্পষ্ট। এ অঞ্চলে দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে এসব ইস্যু নিয়ে চরম উত্তেজনা চলছে। ইমরান খান জাতিসঙ্ঘে স্পষ্ট করে বলেছেন, ছোট দেশ হিসেবে পাকিস্তানের যদি কোনো উপায় না থাকে তাহলে তাকে পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার করতে হবে। বিশ্বসংস্থা হিসেবে জাতিসঙ্ঘের এ হুঁশিয়ারির ব্যাপারে কোনো সচেতনতা দেখা যাচ্ছে না।

মানব জাতিকে যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই জাতিসঙ্ঘের জন্ম। মহাযুদ্ধে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি এই বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানটির জন্মকে যৌক্তিক করে তোলে। তবে প্রতিষ্ঠানটি ৭৫ বছরেও সশস্ত্র সঙ্ঘাত বন্ধে সার্থক হয়নি। এর জন্মের পর এ পর্যন্ত ২৫০টি সশস্ত্র সঙ্ঘাত হয়েছে। কিছু যুদ্ধের কারণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে জাতিসঙ্ঘ নিজেই। লেগে আছে অসংখ্য যুদ্ধ, যেগুলো অচিরেই শেষ হয়ে যাবে, এর কোনো লক্ষণ নেই। শান্তি স্থাপন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা জাতিসঙ্ঘের লক্ষ্য হলেও সব ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির ঘটছে ক্রমাবনতি। বিশ্ব আজ অসংখ্য মত ও পথে বিভক্ত। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছে না। ধর্ম-জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গৌরব-অহঙ্কারে দিশেহারা। এ অহমিকা এখন নগ্নভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।

নিরাপত্তা পরিষদের অভিপ্রায়ে জাতিসঙ্ঘ কাজ করে। এ পরিষদের সদস্য প্রতিটি দেশ দাঁড়াচ্ছে নিজেদের সঙ্কীর্ণ স্বার্থ ও পছন্দের ওপর ভিত্তি করে। বলা দরকার, রোহিঙ্গাদের বেঁচে থাকার অধিকার প্রত্যেক মানুষের মতো অবিচ্ছেদ্য। একজন চীনা, একজন রাশিয়ান ও একজন আমেরিকান নাগরিকের মতো তাদেরও পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার সমান। এটাই যদি ইনসাফ হয় তাহলে নিরাপত্তা পরিষদ একমত হতে কোনো সমস্যা হবে কেন? বোঝা যাচ্ছে, বিশ্বসংস্থাটি যাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তারা ইনসাফের রক্ষক নয়। এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান যাদের ধারকেরা ন্যায়ের পক্ষে নয়, সে প্রতিষ্ঠানটি সার্থকভাবে টিকে থাকতে পারে না।

প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর আলাদা আলাদা অ্যাজেন্ডা রয়েছে। প্রত্যেকে নিজেদের প্রভাববলয় তৈরি করতে চাচ্ছে। রোহিঙ্গারা বেঁচে গেল কি মরে গেল, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয় তাদের জন্য। চীনের দরকার মিয়ানমারে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার। সে দেশে একই স্বার্থ রাশিয়ারও। অন্য দিকে, আমেরিকানদের অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক এমন কোনো স্বার্থ নেই যে, তারা চীন ও রাশিয়াকে টেক্কা দিয়ে রোহিঙ্গাদের জীবনের নিরাপত্তা জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে নিশ্চিত করবে। গত শতাব্দীর শেষভাগে এসে দ্বিমেরু বিশ্ব দেখা গেছে। তাই বেশির ভাগ ঘটনায় বিশ্বনেতৃত্ব দুটো ভাগে বিভক্ত হতো। এখন বিশ্ব যেন অসংখ্য ভাগে বিভক্ত। এর ওপর রয়েছে, দেশে দেশে স্বৈরাচারের নব উত্থান। জাতিরাষ্ট্রের স্বার্থের পাশাপাশি নিজেদের একান্ত ব্যক্তিগত অ্যাজেন্ডাও তাদের রয়েছে। এগুলোকে মোকাবেলা করে জাতিসঙ্ঘ কাক্সিক্ষত ভূমিকা পালন করবে, তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

সারা বিশ্বে জাতিসঙ্ঘের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড রয়েছে। বিশ্বমানুষের স্বার্থে জাতিসঙ্ঘ অনেক ভালো কাজ করে যাচ্ছে। শ্রমিকের স্বার্থরক্ষায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, খাদ্য ও কৃষির উন্নয়নে ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন। বিশ্ববাণিজ্য, মুদ্রা বিনিময়, বিমান চলাচল, জাহাজ চলাচল- এসব ব্যাপারে দেশগুলোর মধ্যে তারা সমঝোতা করে থাকে। বিশ্ব সংস্কৃতি রক্ষা ও গবেষণায় তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। জলবায়ুর ইতিবাচক পরিবর্তনেও রয়েছে তাদের উদ্যোগ। তারা বিশ্বমানুষের জন্য নির্ধারণ করেছে ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল’। এগুলোর প্রতিটির প্রকৃত সফলতা নির্ভর করছে কল্যাণমুখী রাজনীতির ওপর। তবে এ বিষয়ে প্রভাব খাটানোর কর্তৃত্ব আসলে জাতিসঙ্ঘের নেই।

ধরণীর বুকে মানুষেরা একমাত্র প্রজাতি যে নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করে দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসানের পর ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি এবং এর মজুদের প্রতিযোগিতা হ্রাস পেয়েছিল। বিশ্বে তা আবার বাড়ছে। এমনিতে বিশ্বে যে পরিমাণ ভয়াবহ অস্ত্রের মজুদ রয়েছে, সেগুলো দিয়ে এ গ্রহকে ধ্বংসস্তূপ বানিয়ে দেয়া যায়। জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে ভ্রাতৃপ্রতিম বিশ্ব গড়ে তোলার চেয়ে হিংসাবিদ্বেষের বীজ অনেক বেশি রোপিত হচ্ছে। ফলে এক ভয়াবহ ধ্বংসের আশঙ্কাই এ বিশ্বে প্রবল হচ্ছে; যার প্রমাণ প্রতিদিন বিশ্ববাসী পাচ্ছে।

ইমেইল: [email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.