Home ইতিহাস ও জীবনী মওলানা বরকতুল্লাহ আমাদের ইতিহাসের কে হন?

মওলানা বরকতুল্লাহ আমাদের ইতিহাসের কে হন?

আব্দুল হাফিজ মুহাম্মদ বরকতুল্লাহ (৭ জুলাই ১৮৫৪ - ২০ সেপ্টেম্বর ১৯২৭)।

।। আলতাফ পারভেজ ।।

বিতর্কটা শুরু হয় গত বছর। মূলত ভারতে। অংশত উপমহাদেশের অন্যত্রও। ১৯৪৭-পূর্ব সময়ের ইস্যু। অর্থাৎ বিতর্কের সময়টা বাংলাদেশ-পাকিস্তান-ভারত একসঙ্গেই ছিল। ফলে এই বিতর্কে বাংলাদেশেরও হক আছে। আগেও এ নিয়ে লিখেছিলাম একবার। এখনও এই বিতর্কের ফয়সালা হয়নি। তাই আবারও প্রশ্নটি তোলা।

মওলানা বরকতুল্লাহকে নিয়ে প্রশ্নটা যতটা ইতিহাসের– তার চেয়ে বেশি ইতিহাস পাঠের পদ্ধতিরও। ফলে বাংলাদেশ থেকেও তাতে বারবার অংশ নেয়ার সুযোগ আছে।

এই বিতর্কে উৎসাহিত করেছেন কলকাতার গবেষক ও শিক্ষক অনিবার্ণ মিত্র। আউটলুক ম্যাগাজিনে ২০১৮ সালে এক লেখায় তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ভারতের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী কাকে গণ্য করা হবে?

স্বভাবত দাবি উঠেছে, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ১৯৪৩-এর অক্টোবরে সিঙ্গাপুরে যে অস্থায়ী‘হুকুমত-এ-আজাদ-হিন্দ’ সরকার প্রতিষ্ঠা হয় তাতে রাষ্ট্রপ্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী উভয় দায়িত্বে ছিলেন নেতাজি। উপমহাদেশজুড়ে নানানভাবে তার স্বীকৃতিও রয়েছে। যদিও ঐ সরকারের অধীনে লম্বা সময় ধরে কোন ‘সার্বভৌম অঞ্চল’ ছিল না।

অনেক ইতিহাসবিদ এখন নেতাজি’র‘হুকুমত-এ-আজাদ-হিন্দ’-এর ঐতিহাসিক সংগ্রামী ভূমিকা স্বীকার করেও বলতে চাইছেন, এই সরকারের পূর্বেও ব্রিটিশ অধীনতা থেকে উপমহাদেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে ব্যাপকভিত্তিক আরেকটি প্রবাসী সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯১৫ সালের ১ ডিসেম্বর কাবুলে। যার নাম ছিল, ‘হুকুমত-এ-মুকতার-ই-হিন্দ’। প্রতিষ্ঠার পর অন্তত তিন-চার বছর, ১৯১৯ পর্যন্ত এই সরকার ভারতকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে সামরিক ও কূটনীতিক নানান তৎপরতা চালিয়েছিল। যে সরকারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ এবং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মওলানা বরকতুল্লাহ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি।

কিন্তু নেতাজির‘হুকুমত-এ-আজাদ-হিন্দ’ উপমহাদেশের ইতিহাসচর্চায় যেরূপ স্বীকৃতি পেল, রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ, মওলানা বরকতুল্লাহ এবং ওবায়দুল্লাহ সিন্ধিদের ‘হুকুমত-এ-মুকতার-ই-হিন্দ’ সেরূপ স্বীকৃতি পেল না। না ভারতে, না পাকিস্তানে, না বাংলাদেশে।

এর মাঝে রাজা মহেন্দ্রকে নিয়ে ইতিহাসচর্চার পরিসরে কিছু আলাপ-আলোচনা হলেও মওলানা বরকতুল্লাহ (পুরো নাম আব্দুল হাফিজ মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ) ইতিহাসে প্রাপ্য সম্মান পেয়েছেন সামান্যই। কিন্তু কেন? এই হলো প্রথম প্রশ্ন।

[দুই.]

কেবল ইতিহাসই নয়, নেতাজির‘আজাদ হিন্দ সরকার’ ইতোমধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশের সাধারণ মানুষের সংগ্রামী রাজনৈতিক আবেগেরও অংশীদার। নানান রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ছাড়াও বহু ডাকটিকিটও প্রকাশিত হয়েছে ঐ সরকারের রাষ্ট্রনৈতিক স্বীকৃতি হিসেবে। ঐ সরকারের পূর্বাপর ভূমিকা নিয়ে বহু অনুসন্ধানী কিতাবও লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে।

কিন্তু যে সংগ্রামী অবস্থান থেকে সর্বত্র আজাদ হিন্দ সরকারকে স্বীকার করা হয়– একই ধরনের রাজনৈতিক যুক্তি ও অবস্থান থেকেই রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ ও মওলানা বরকতুল্লাহদের সরকারকে স্বীকৃতি দিতে বাধা কোথায়? আউটলুক ম্যাগাজিনে অনিবার্ণ মিত্র ঠিক এই প্রশ্ন তুলে বলছেন-

১৯৪৩ এবং ১৯১৫-এর উভয় সরকারের লক্ষ্যই ছিল উপমহাদেশকে ব্রিটিশ অধীনতা থেকে স্বাধীন করা। উভয় সরকারই ছিল অস্থায়ী চরিত্রের। তাদের‘সফলতা’য় সামান্য হেরফের আছে। কিন্তু উপহমহাদেশের মানুষদের দ্বারাই উভয় ‘সরকার’ পরিচালিত হচ্ছিলো। উভয় সরকারই তখনকার বৈশ্বিক পরিসরে ব্যাপক কূটনীতিক স্বীকৃতি ও সহায়তা পাচ্ছিলো। কিন্তু ইতিহাসবিদরা ১৯১৫-এর সরকার নিয়ে অনুসন্ধানে কার্পণ্য করেছেন বলেই স্পষ্ট সাক্ষ্য মেলে। এই উদাসীনতার কারণ কী হতে পারে? এই হলো আরেক জিজ্ঞাসা।

[তিন.]

এটা খুব গতানুগতিক এক প্রশ্ন যে, মওলানা বরকতুল্লাহকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে উপমহাদেশের মূলধারার ইতিহাসবিদদের উদাসীনতা তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কি না? সেক্ষেত্রে রাজা প্রতাপ কী তবে দুর্ভাগ্যের শিকার? এ প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর দেয়া কঠিন। চাইলেও অনেকে দু’য়ে দু’য়ে চার মেলাতে পারবেন না মওলানা বরকুতল্লাহকে নিয়ে। রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি ছিলেন একইসঙ্গে সেক্যুলার ও ইসলামী আন্তর্জাতিকতাবাদী। ভারতের মুসলমান ঐতিহ্যে অন্য সকল ধর্মের মানুষের সঙ্গে মিলে উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে পাল্টা রাজনৈতিক হেজিমনির চেষ্টায় লিপ্ত থাকাদের মধ্যে অতি সাহসী একজন অবশ্যই বরকতুল্লাহ।

গোলামির জিঞ্জির ভেঙ্গে উপমহাদেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে এই মওলানা তখনকার বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর প্রধান প্রধান রাজনীতিবিদ অনেকের সঙ্গেই দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি সাতটি ভাষায় ওস্তাদ ছিলেন– যা তাঁকে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ গড়ে তুলতে বিশেষ সাহায্য করছিল। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি যাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করেন তার মধ্যে লেনিন ও ট্রটস্কিও ছিলেন। রাশিয়ায় তখন তাঁর যে সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে তিনি নিজেকে‘কমিউনিস্ট নয়, বরং পুঁজিতন্ত্র বিরোধী জিহাদি’ হিসেবে পরিচয় দেন। মার্কস ও ইসলাম বিষয়ে তাঁর সেসময়কার প্রথাবিরোধী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ [`Bolshevism and Islamic Nations’] মূলধারার কমিউনিস্টদের কাছে তাঁকে আজও বিব্রতকর করে রেখেছে। এবং ইসলামিস্টদের কাছেও! স্মরণযোগ্য, পরবর্তীকালের আরেক মওলানা- আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়েও উপমহাদেশের কমিউনিস্ট ও ইসলামপন্থীদের একই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। এই হয়রান অবস্থা কবুল করেই মওলানা বরকতুল্লাহকে নিয়ে আরও দু’চার কথা বলা দরকার। ১৯১৩ সালে স্যানফ্রান্সিসকোতে ভারতীয় কমিউনিস্টদের‘গদার পার্টি’রও প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। এইরূপ আন্তর্জাতিক যোগাযোগ গড়তে যেয়েই তিনি এক সময় আফগান বাদশা হাবিবুল্লাহ খানের বন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন এবং তাঁর পরিবারের সহযোগিতার আশ্বাসেই রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ এবং আরও কয়েকজন বিপ্লবীর যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘হুকুমত-এ-মুকতার-ই-হিন্দ’। মৌলভী বশির ছিলেন এই সরকারের যুদ্ধমন্ত্রী এবং সি. পিল্লাই ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। হাবিবুল্লাহ খানের ভাই নসরুল্লাহ খান প্রবাসী এই ভারতীয় সরকারের একজন বড় উৎসাহদাতা ছিলেন। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব কাবুলের এই প্রবাসী ভারতীয় সরকারকে সেদিন বিশেষভাবে উজ্জীবিত করেছিল। বলশেভিকদের সঙ্গে তারা যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন- সেটা তো আগেই বলা হলো। বেশ কয়েক বছর তিনি রাশিয়ায় ছিলেন ঐসময়। ১৯১৯-এ লেনিনের সঙ্গে তাঁর এক দফা সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়।

রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ ( ১ ডিসেম্বর ১৮৮৬ – ২৯ এপ্রিল ১৯৭৯)।

রাজা মহেন্দ্র প্রতাপও ছিলেন বরকতুল্লাহর মতোই একজন আন্তর্জাতিক স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে বহুজনবাদী। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকখানি জমি মহেন্দ্র প্রতাপদের পরিবারেরই দেয়া। ১৯১৪ সালে তিনি দেশ ছাড়েন। মহেন্দ্র প্রতাপের সঙ্গে বরকতুল্লাহ’র সখ্যতা গড়ে উঠেছিল লন্ডনে। বরকতুল্লাহ তাত্ত্বিকভাবে মনে করতেন, হিন্দু-মুসলমান-শিখদের ঐক্য ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় উপনিবেশবিরোধী মুক্তি সংগ্রাম অর্থপূর্ণ কোন পরিবর্তন আনতে সক্ষম নয়। এইরূপ চিন্তা করতেন মহেন্দ্র প্রতাপও। এরূপ ভাবনা থেকেই তাঁদের মৈত্রী গড়ে উঠেছিল। তবে এক্ষেত্রে `গদার পার্টি’রও ইন্ধন ছিল। আর ছিল রুশ বলশেভিকদের সহযোগিতার আশ্বাস।

এক প্রসঙ্গের সঙ্গে আরেক প্রসঙ্গ চলে আসে। উপমহাদেশর ইতিহাসচর্চার আরেক অবহেলিত প্রসঙ্গ ‘গদার পার্টি’র ভূমিকা। ১৯১৩-তে উত্তর আমেরিকায় সংগঠিত হয়েও মাত্র এক বছরের মধ্যে যেভাবে ভারতবর্ষে তারা উপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সূচনা করতে পেরেছিল তার পূর্বাপর এখন সামান্যই আলোচিত হয়। সেটাও কী এই কারণে যে, এই অকুতোভয় বিপ্লবীদের মূল সংগঠকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিখ ছিলেন বলে? উপমহাদেশের ইতিহাসচর্চা নিশ্চয়ই একদিন এসব সংকীর্ণ ধর্মীয় বিবেচনা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে বলেই আশা করা যায়। কিন্তু সেটা আর কবে হবে?

[চার.]

আমরা আবার মূল আলোচনায় ফিরে যাই। ১৯১৫-এর ডিসেম্বরে কাবুলে প্রতিষ্ঠিত রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ ও মাওলানা বরকতুল্লাহ’র‘হুকুমত-এ-মুকতার-ই-হিন্দ’ অস্থায়ী প্রবাসী ভারতীয় সরকার যে বেশি দিন কাজ করতে পারেনি সেটা সবারই এখন জানা। ব্রিটিশ চাপে এবং নিজের গদি নিরাপদ করতে এক পর্যায়ে আফগান আমির ১৯১৯-এ প্রবাসী ভারতীয় সরকারের কাজে বাধা দিতে শুরু করেন। এসময় মহেন্দ্র প্রতাপ জাপান চলে যান। মওলানা বরকতুল্লাহও অনেক বছর জাপানে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারত বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন। পরে তিনি চলে যান স্যানফ্রান্সিসকো। সেখানেই একটা হাসপাতালে ১৯২৭-এর ২০ সেপ্টেম্বর মারা যান তিনি। ক্যালিফোর্নিয়াতেই তাঁর কবর রয়েছে।

আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে উপমহাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী মওলানা বরকত উল্লাহ’র কবর।

মওলানা বরকতুল্লাহর মৃত্যুর ১৯ বছর পর মহেন্দ্র প্রতাপ জাপান থেকে ভারতে ফিরে আসেন ১৯৪৬-এ। ১৯৭৯ সালে মৃত্যুর পূর্বে তিনি লোকসভায়ও একবার নির্বাচিত হয়েছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আজকের বিজিপি’র অটল বিহারি বাজপেয়িকে হারিয়ে। ইতিহাসবিদদের কাছে মওলানা বরকতুল্লাহ’র বিপ্লবী জীবনের অনেক তথ্যেরই উৎস ছিলেন মহেন্দ্র প্রতাপ। বস্তুত পক্ষে, তিনি ভারতে ফিরে এসেছিলেন বলেই বরকতুল্লাহ ইতিহাস থেকে একেবারে হারিয়ে যাননি।

শুনেছি, ভোপালের মুসলমান রাজনীতিবিদরা অনেকদিন থেকেই তাদের এই পূর্বপুরুষ মওলানার কবর উপমহাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য দাবি জানিয়ে আসছে। প্রতিবছর বরকতুল্লাহ’র মৃত্যু বার্ষিকীতে এই দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চারিত হয়। স্থানীয় সমাজে যিনি এখনও বিশেষভাবে পরিচিত ‘বরকতুল্লাহ ভোপালী’ নামে। মধ্যপ্রদেশের মুসলমানদের ঐ জনদাবির পাশাপাশি একাডেমিক জগতেও এখন ক্রমে এই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে, উপমহাদেশের ইতিহাসে মাওলানা আবদুল হাফিজ মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ কীভাবে পরিচিত হবেন?

এ বিষয়ে উপমহাদেশের প্রাচ্যবিদরা কী ভাবছেন?

– আলতাফ পারভেজ, গবেষক।
ইমেইল- [email protected]

আরো পড়তে পারেন-

‘দুর্যোগে মানুষকে সহায়তার রাজনীতি’

‘ভাইরাস ও ভ্যাকসিন ব্যবসা: এখনি সোচ্চার হওয়ার সময়’

‘নতুন ‘সামাজিক’ চুক্তি দরকার’

ফেসবুকে ঝগড়া-ঝাঁটিতে কার লাভ হয়?