Home ইসলাম কুরআন-হাদীসের আলোকে মাযহাব না মানার ক্ষতি

কুরআন-হাদীসের আলোকে মাযহাব না মানার ক্ষতি

- উম্মাহ গ্রাফিক্স।

।। মুফতি জাকির হোসাইন কাসেমী ।।

দুনিয়ার শাশ্বত চিরন্তন নিয়ম অনুযায়ী মানুষ দুই শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। এক শ্রেণীর যারা জানে, বুঝে এবং পন্ডিত। দ্বিতীয় শ্রেণীর যারা জানে না, বুঝে না। প্রথম শ্রেণীর লোক স্বীয় মেধা, জ্ঞান দ্বারা নীতিমালা রচনা করে নিজেই আমল করতে পারেন। এদের পরিচয়, এরা মুজতাহিদ। আর দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক জ্ঞানের স্বল্পতার দরুন প্রথম শ্রেণীর লোকদের কাছে যায় এবং তাদের নীতিমালার অনুসরণ করে। এদের পরিচয়, এরা মুক্বাল্লিদ। প্রথম শ্রেণী সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন-

“তোমরা স্বীয় জ্ঞান-হিকমত দ্বারা মু’মিনদের উপদেশ দাও।” আর সাধারণ মু’মিনগণ সেই হিকমত দ্বারা জীবন পরিচালনা করবে। দ্বিতীয় শ্রেণী সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন- “তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানীদের থেকে জেনে নাও, বুঝে নাও।”

উপরোক্ত আলোচনা হতে মুজতাহিদ ও মুক্বাল্লিদের মর্ম স্পষ্ট হয়ে যায়।

মানুষ নীতিগতভাবে এই দুই শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর গাইরে মুক্বাল্লিদ বলতে এমন শ্রেণীকে বুঝায় যারা নিজেরা মুজতাহিদও নয় এবং মুক্বাল্লিদও নয়, বরং অন্য কিছু। যেমন একজন মানুষ ইমামও নয়, মুক্তাদীও নয়, বরং কখনো ইমামকে গালি দেয় আবার কখনো মুক্তাদীদের সাথে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় লিপ্ত হয়। এরাই সমাজে লামাযহাবী নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এরা যেন রাষ্ট্রের রাজা নয়, প্রজাও নয়, বরং রাষ্ট্রদ্রোহী সন্ত্রাসী।

সাহাবায়ে কিরামও উপরোক্ত দুই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সাহাবায়ে কিরামের সংখ্যা ছিল এক লাখের ঊর্ধ্বে। তাঁদের সবাই আরবী ভাষী ছিলেন। যাদের মধ্যে ১৪৯ জন সাহাবী মুফতি ছিলেন।

তন্মধ্যে ৭ জন ছিলেন মুক্সিরীন বা অধিক পরিমাণ ফাতওয়া দানকারী। ২০ জন ছিলেন মুতাওয়াসসিতীন বা মধ্যম পর্যায়ের ফাতওয়া দানকারী। ১২২ জন ছিলেন মুক্বিল্লীন বা স্বল্প পরিমাণ ফাতওয়া দানকারী। এসব ফক্বীহ্ মুফতি সাহাবীদের হাজার হাজার ফাতওয়া মুসান্নিফে ইব্নে আবী শাইবা, মুসান্নিফে আব্দুর রাজ্জাক, তাহ্যীবুল আসার, মায়ানীউল আসার প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। কেবল মুসান্নিফে আব্দুর রাজ্জাক গ্রন্থেই সাহাবী, তাবিঈদের ১৭০০ ফাতওয়ার সন্ধান পাওয়া যায়। সেসব মুফতি সাহাবীগণ শুধু ফাতওয়া, মাস্আলা বর্ণনা করেছেন, তার সাথে কুরআন ও হাদীসের কোন দলীল উল্লেখ করেননি এবং অবশিষ্ট সাহাবীগণ বিনা দ্বিধায় দলীল চাওয়া ছাড়া সেসব ফাতওয়ার উপর আমল করেছেন। এ বাস্তবতার নামই তাক্বলীদ।

আরও পড়তে পারেন-

যুগে যুগে মহামারীর ইতিকথা

করোনা মহামারি, দুষ্কর্ম ও দুর্নীতি

মহানবী (সা.)এর মহিয়সী সহধর্মীনীগণ

গুগলের ম্যাপসের যে ব্যবহার জানা থাকা চাই

অমুসলিমদের সাথে ইসলামের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নীতি

উপরোক্ত আলোচনা থেকে পরিস্কার হয়ে যায় যে, সাহাবী ও তাবিঈনের যুগে এই ‘তাক্বলীদে শখসী’র ব্যাপক প্রচলন ছিল। এর উপর সবার ইজমা কায়েম হয়েছিল। তাক্বলীদের এই পদ্ধতিকে কেউ অস্বীকার করেননি। (ইকদুল জীদ- ৩৬)।

দুঃখজনক হলেও সত্য, ১৪০০ বছর পর কথিত আহলে হাদীস নামধারী দলটি তাক্বলীদের এই ধারাবাহিকতাকে অস্বীকার করে দ্বীন ও ইসলামের যে ক্ষতি সাধন করছে তা নিম্নরূপ-

(১) তাক্বলীদে শখসী না মানার দরুন দ্বীনের মধ্যে যে ক্ষতি ও বিশৃখলা সৃষ্টি হয়, তা বাস্তব চাক্ষুস প্রমাণ দ্বারা স্পষ্ট। বিশেষ করে বর্তমান যুগে মানুষের মুক্ত চিন্তা চেতনা ও কুপ্রবৃত্তির বিস্তার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি মানুষের নফ্স শয়তানের কাছে সম্পূর্ণ দায়বদ্ধ হয়ে পড়েছে। জাতির এই নৈতিক অধঃপতন ও ক্রান্তিলগ্নে যদি ব্যাপক ইজতিহাদের অনুমতি দেওয়া হয়, তবে তার ফলাফল এই দাঁড়াবে যে, যদি কোন ব্যক্তি কোন রকমে কুরআন ও মিশকাতের তরজমা শিখে ফেলে তাহলে সে বলে ফেলবে যে, অন্যদের ইজতিহাদ গ্রহণযোগ্য হলে আমারটা কেন গ্রহণযোগ্য হবে না? আর ইজতিহাদ যখন এমন ব্যাপক হবে তখন দ্বীনের আহ্কামের মধ্যে পরিবর্তন পরিবর্ধন শুরু হয়ে যাবে। আমি মনে করি, এ মহা সত্যকে কোন কথিত আহলে হাদীসও অস্বীকার করতে পারবে না। আর কিছু নব্য মুজতাহিদ দাবী করে বসবে যে, পূর্ববর্তী মুজতাহিদগণ স্বীয় ইজতিহাদী যোগ্যতা বলে কুরআন-হাদীসের কিছু অংশকে শরয়ী কারণের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করেছেন এবং তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য সাব্যস্ত হয়েছে। তাহলে আমরাও এরূপ কাজ করব। এতে কোন অসুবিধা নেই।

যদি এরূপ ইজতিহাদের ছড়াছড়ি শুরু হয় এবং তা অনুমোদন যোগ্য হয়, তাহলে দ্বীন, শরীয়ত হিসেবে অবশিষ্ট থাকবে না। বরং বাচ্চাদের পুতুল খেলার বস্তুতে পরিণত হয়ে যাবে। (নাঊযুবিল্লাহ্)।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ তাক্বলীদ না মানার কারণে কেউ প্রভুত্বের দাবী করেছে, আবার কেউ নবুওয়্যাতের দাবী করেছে। আবার কেউ ইমাম মাহ্দী হওয়ার দাবী করেছে। কারো ক্ষেত্রে তাক্বলীদ বাদ দেওয়াটা হাদীসে নববীকে অস্বীকার করার সহায়ক হয়েছে। আবার কেউ যুগের মুজাদ্দিদ বলে দাবী করে বন্ধু বেশে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্কে গোমরাহ্ ও পথভ্রষ্টতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আল্ হামদুলিল্লাহ্, আজ পর্যন্ত কোন মুক্বাল্লিদ বা মাযহাবপন্থী লোক এ ধরনের ফিতনার শিকার হননি। (আহ্সানুল ফাতওয়া-১/৪১)।

(২) যদি তাক্বলীদে গায়রে শাখসীর অনুমতি দেওয়া হয়, তবে মানুষ নফ্সের পূজারী হয়ে দ্বীন থেকে হাত ধুয়ে ফেলবে। অর্থাৎ তার মনে কুপ্রবৃত্তির দরুন যা সহজ বোধ্য অনুভূত হবে, তাই কেবল মান্য করবে। যেমন, ওযূ করার পর কেউ মহিলার শরীর স্পর্শ করেছে, তখন সে বলবে আমি হানাফী। আর রক্ত প্রবাহিত হলে বলবে আমি শাফিঈ। আর যদি উভয়টা হয় তাহলে সে যদি উপরোক্ত তা’বীল করে ওযূ ব্যতীত নামায পড়ে নেয়, তাহলে সর্বসম্মতিক্রমে তার নামায শুদ্ধ হবে না। আর এটিই হল দ্বীনকে স্বীয় প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণাধীন করে নফ্স পূজারীতে জড়িয়ে পড়া। যা পবিত্র কুরআনে কাফিরদের স্বভাব বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- “যারা স্বীয় কুপ্রবৃত্তিকে মা’বূদ স্থির করে পূজায় লিপ্ত হয়েছে।”

অন্য আয়াতে এ শ্রেণীর মানুষদেরকে কুকুরের সাথে তুলনা করে ইরশাদ হয়েছে- “তার উদাহরণ কুকুর ও পশু সমতুল্য।”

অতএব, তাক্বলীদ না মানার দরুন মানুষ ও পশুর মধ্যেকার ব্যবধান বাকী থাকে না। এজন্য প্রত্যেক গায়রে মুজতাহিদের জন্য নির্দিষ্ট ইমামের তাক্বলীদ করা ওয়াজিব বা আবশ্যকীয়।

(৩) তাক্বলীদে শখসী বর্জন করার দরুন জনসাধারণের মধ্যে দ্বীনের ব্যাপারে উদাসীনতা, অবজ্ঞা, সুবিধাবাদ, সর্বোপরি পরস্পরের মধ্যে অনৈক্য ও হিংসা-বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়। হযরত থানবী (রাহ্.) বলেন, তাক্বলীদে শাখসী বর্জন করার দরুন দ্বীনের মৌলিক ৫টি কাজের মধ্যে দুর্বলতা, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। (১) ইলম ও আমলের মধ্যে বিশুদ্ধ নিয়্যাত রাখা, (২) স্বীয় কুপ্রবৃত্তির উপর দ্বীনকে বিজয়ী রাখা, (৩) এ রকম জিনিস থেকে বেঁচে থাকা যা দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর, (৪) আহলে হকের ইজমা তথা সর্বসম্মত রায়কে মান্য করা, (৫) ইসলামের গন্ডি থেকে বের না হওয়া।

এ পর্যায়ে তক্বলীদ বর্জনের কুফল এই দাঁড়ায়- (১) নিয়্যাতের মধ্যে গড়বড় এসে যায়। (২) দ্বীন নফসের গোলামে পরিণত হয়ে যায়। (৩) দ্বীনি ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। (৪) ইজমার প্রতি কটাক্ষ ও বিরোধিতা করা হয়। (৫) ইসলামের সীমানা ছেড়ে পশুত্বের স্তরে পৌঁছে যায়। পক্ষান্তরে তাক্বলীদ মান্য করলে দ্বীনের উপরোক্ত ৫টি বিষয়ে কোন প্রকার অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা নেই। (আল-ইক্বতিসাদ- ৩৯, আহ্সানুল ফাতওয়া- ৪১৪)।

(৪) তাক্বলীদে শাখসী না মানার কারণে ওয়াজিব তরক হয়। কেননা, দ্বীনের আহ্কাম ও মৌলনীতি হিফাযত করা ওয়াজিব। আর এ ওয়াজিব পালন করার জন্য তাক্বলীদ হল ভূমিকা বা পূর্বমাধ্যম। আর সর্বজন স্বীকৃত মূলনীতি হল- ওয়াজিব আদায়ে যা সহায়ক ও মাধ্যম, তাও ওয়াজিব। এ দৃষ্টিকোণ থেকে তাক্বলীদ ওয়াজিব। যেমন- তীর পরিচালনা প্রশিক্ষণ ও রণকৌশল ট্রেনিং শরীয়তের মধ্যে কোন ইবাদত নয়। কিন্তু শরীয়ত হিফাযতের জন্য এটি মাধ্যম। এজন্য জিহাদের প্রশিক্ষণ অর্জন করাটাও ওয়াজিব- ‘ওয়াজিব আদায়ে যা সহায়ক ও মাধ্যম, তাও ওয়াজিব’ এই মৌলনীতির ভিত্তিতে। শুধু তাই নয়, বরং যুদ্ধকৌশল বা ট্রেনিং শিখে ভুলে যাওয়াকে গুনাহ্ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হাদীস শরীফে আছে- যে ব্যক্তি তীর পরিচালনা শিখে ভুলে যাবে অথবা বর্জন করবে, সে আমার উম্মত ভুক্ত নয়। (মিশকাত শরীফ- ২২৮)।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর মনোনীত বান্দা তথা পুরস্কারপ্রাপ্ত মানুষের পথ ও মত অনুসরণ করে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন॥

লেখকঃ মুহাদ্দিস- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা ঢাকা, খতীব- তিস্তা গেট জামে মসজিদ টঙ্গী, গাজীপুর, উপদেষ্টা- উম্মাহ ২৪ ডট কম এবং কেন্দ্রীয় অর্থসম্পাদক- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। ই-মেইল- [email protected]

উম্মাহ২৪ডটকম:এমএমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

করোনাভাইরাস: আল্লাহর রহমত ও দয়া পেতে হলে হক্ব ও সৎকর্মে দ্রুত ফিরে আসা জরুরী