Home ওপেনিয়ন পুঁজিবাদের সর্বগ্রাসী রূপ

পুঁজিবাদের সর্বগ্রাসী রূপ

।। মনোয়ারুল হক ।।

শিল্পবিপ্লব পৃথিবীর মানুষের যতখানি বিকাশ ঘটিয়েছে তার থেকে আজ অনেক বেশি ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পৃথিবীতে পুঁজিবাদের বিকাশ ও তার রূপ গত ৫০ বছর যে সর্বগ্রাসী চেহারা ধারণ করেছে তা পুঁজিবাদ বিকাশের প্রথম শতাব্দীতে ছিল না। কার্ল মার্কস, লেলিন, মাওসেতুং যে পুঁজিবাদ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন তা আজকের এই ধ্বংসাত্মক পুঁজিবাদ নয়। তাঁরা যে পুঁজিবাদকে সাম্রাজ্যবাদ বলেছেন তাকেও হার মানিয়েছে আজকের পুঁজিবাদ।

শিল্পবিপ্লবের পর থেকেই পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ব্যাপক জীবাশ্মজ্বালানি ব্যবহারের ফলে উৎপাদিত কার্বন ডাইঅক্সাইড পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়াতে প্রধান ভূমিকা রাখে। গতবছর (২০১৯) পৃথিবীর তাপমাত্রার গড় বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পরিণাম আমাদের সকলের জানা। উত্তর মেরুর বরফ গলা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, খরা, তীব্র ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস ইত্যাদির কারণে প্রতি বছর ব্যাপক জানমালের ক্ষতির পাশাপাশি বহু প্রাণি প্রকৃতি থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়।

এন্টিবায়োটিকের আবিষ্কার মানব ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এন্টিবায়োটিক মানবদেহে বিস্ময়করভাবে কাজ করে। এর জীবাণু প্রতিরোধী পদার্থগুলো সংক্রমণ এবং রোগ প্রতিরোধ করে। কিন্তু আমাদের শরীর থেকে নিঃসৃত হবার পর এই পদার্থগুলো জলপথে ছড়িয়ে যায় এবং পরিবেশের ক্ষতি করে। কিছু ‘সুপার’ জীবাণু তৈরি হয় যেটা আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে বিপন্ন করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এন্টিবায়োটিক পানিতে মিশে যাওয়ার ফলে জলজপ্রাণির প্রজননে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জলজপ্রাণির ডিম্বাণু দ্রুত মরে যায় এবং শ্যাওলা জাতীয় জলজ উদ্ভিদের বৃদ্ধি থেমে যায় যা জলজপ্রাণির খাদ্য হিসেবে বিবেচিত। মানবসমাজের বিকাশের নামে এন্টিবায়োটিক দিয়ে হুমকির মধ্যে ফেলা হয়েছে পৃথিবীর প্রাণিকুল, পরিবেশ, প্রতিবেশ এমন কি নদী ও সমুদ্রের পানি।

পুঁজিবাদের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন বাজার ও ভোক্তার সক্ষমতা। শিল্পবিপ্লবের সময়ে পৃথিবীর জনসংখ্যা ১০০ কোটির নিচে ছিল, যা আজকে ৭৮০ কোটিতে পৌঁছে গিয়েছে। মুনাফার সাথে সাথে বিশাল জনগোষ্ঠির চাহিদার জন্য নতুন নতুন পণ্য, ঔষধ, উচ্চ ফলনশীলতা সবই হয়েছে। ক্যান্সার, এইচআইভি সহ নানা ধরনের রোগ বালাই প্রতিরোধ ও প্রতিকার, ভাইরাস, মহামারি মোকাবেলা অন্যদিকে শল্য চিকিৎসার ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছে। যক্ষ্মা, কলেরা, বসন্ত, প্লেগ, পোলিও, টাইফয়েড পুজিঁবাদের কাছে হার স্বীকার করেছে।

আরও পড়তে পারেন-

প্রথম শিল্প বিপ্লব যেমন পুঁজিবাদের বিকাশের নতুন রাস্তা দেখিয়েছে তেমনি হোমোসেপিয়ানদের বেঁচে থাকার বয়স (গড় আয়ু) দ্বিগুণ করেছে। শিল্প বিপ্লবের আগে মানুষের গড় আয়ু ছিল ৪০ বছর। শিশু মৃত্যুর হার ছিল ৪০% যা শিল্প বিকাশ আর পুঁজিবাদ বিকাশের ফলে পৃথিবীর নানা দেশে নানা মাত্রা ধারণ করছে। জাপানে মানুষের গড় আয়ু ৯০ তে পৌঁছেছে। আমরা ৭০ বছরের মধ্যে আছি। পুঁজিবাদের বিকাশ হোমোসেপিয়ানদের জীবন ব্যবস্থার পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়েছে। পুঁজিবাদ পৃথিবীর নারীদের জীবনের অধিকার স্বীকার করেছে।

পুঁজিবাদী দেশগুলিতে নারী তার জীবনের নতুন ব্যাখ্যা খুঁজে পেয়েছে। নারী এখন আর উৎপাদন ও পুনঃউৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কেবল সন্তানধারণের কাজে ব্যস্ত থাকে না। যে কারণে উন্নত (সামাজিকভাবে উন্নত) পুঁজিবাদী দেশগুলিতে জনসংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। নারী পুরুষের সম্পর্ক পরিবর্তন হচ্ছে।  নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন ঘটেছে পুরোটা শতাব্দী জুড়ে।

প্রথম শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে যন্ত্রের আবিষ্কার। যন্ত্র চালানোর জন্য দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব বিদুৎ নিয়ে এলো, এসবই ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর কথা। এই যন্ত্র ও বিদুৎ বদলে দিল পৃথিবীকে। যন্ত্রচালানোর জ্বালানি বিদ্যুৎ আর বিদ্যুৎ এর জ্বালানি মাটি ও সাগরের তলদেশের খনিজ তেল ও গ্যাস। যা নিয়ে শুরু হল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্দ্ধের যাত্রা। সেই যাত্রা পৃথিবীকে পৌঁছে দিলো এক মরণ যাত্রায়, যার নাম জাতীয়তাবাদ।

বিংশ শতাব্দীর গোড়াতে জাতীয়তাবাদের সুনামি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের জন্ম দিলো। পুঁজিবাদের গর্ভে জন্ম নেওয়া জাতীয়তাবাদ বিভৎস রূপ নিয়েছে। এরই নাম সাম্রাজ্যবাদ। যদিও একে সাম্রাজ্যবাদ নামের মধ্যে সীমিত না রেখে নতুন কোন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা দরকার।

তেল গ্যাসের মালিকানা থেকে জন্ম নেয় ফিলিস্তিনি সংকট। শিল্পবিপ্লব ও পুজিঁবাদের জনক বৃটিশরা মধ্যপ্রাচ্যে তার নিয়ন্ত্রণ নিরঙ্কুশ করার স্বার্থে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা ইহুদি সম্প্রদায়কে সংগঠিত করে মধ্যপ্রাচ্যের ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়া এবং তারই পথ ধরে কাশ্মীর সমস্যা এসবই পুজিঁবাদের হিংস্রতা। কাশ্মীর ও ফিলিস্তিন উভয় ক্ষেত্রেই সম্প্রদায়গতভাবে মুসলিমদের বিপক্ষের ঘটনা। দীর্ঘকাল ধরে পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়ার মাটিতে যুদ্ধ চালায় মার্কিন হিংস্র পুঁজিবাদ। মার্কিনীদের একমাত্র যুদ্ধ যেখানে তারা পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করে। পেছন থেকে সমর্থন ছিল চীন ও রাশিয়ার। ভিয়েতনামে পরাজয় স্বীকার করে মার্কিন বাহিনী।
 
ভয়ঙ্কর হিংস্র পুজিঁবাদী দেশ মার্কিনরা ২য় বিশ্বযুদ্ধকালেই ১৯৪৪ সালে তাদের মুদ্রা ডলারকে বিশ্ব বাণিজ্য মুদ্রায় পরিণত করতে পারার ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। যুদ্ধে পরাজিত জাপান তার নিজ মুদ্রায় বাণিজ্য অব্যাহত রাখে। প্রায় ৩০/৪০ বছর পর ইউরোপীয়নরা মার্কিন ডলারের অপরিসীম দৌরাত্ম ও ক্ষমতা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল তা বুঝতে পেরে মার্কিন ডলারের ক্ষমতার বাইরে ইউরো মুদ্রা গড়ে তোলে। যার ফলে নিজেদের বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। যা মার্কিন হিংস্র পুজিঁবাদের হাত থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে নতুন মেরুকরণ হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন মৈত্রী জোট ওয়ারস গঠন করে। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে সমাজতন্ত্র রফতানি করে নতুন সামরিক জোট গঠন করে। আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি নিয়ে গঠন করে ন্যাটো জোট। এই দুই জোট পৃথিবীকে নতুন মাত্রায় সামরিকীকরণের দিকে ধাবিত করে। হাজার হাজার পারমাণবিক অস্ত্র ভান্ডার গড়ে তোলা হয়। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে সমাজতন্ত্র রফতানির নামে এশিয়ার দেশ আফগানিস্তান দখল করে নেয়।

মাওয়ের দেশ চীন তাঁর মৃত্যুর পরই সমাজতন্ত্রের গল্প থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজতে থাকে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৯ সাল প্রায় ১৩ বছর সময় লাগে এই ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে। ১৯৮৯ সাল থেকে চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টি মুক্ত বাজার অর্থনীতি তথা ব্যক্তি পুঁজির বিকাশের রাস্তায় হাঁটতে থাকে। কিন্তু সেখানেও ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতা নাই। তার পরেও দেশটি উন্নতির চরম শিখরে। দেশটি এখন হিংস্র পুঁজিবাদ মার্কিনীদের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধে লিপ্ত।

চীন তার নতুন ধরনের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের মাধ্যমে পশ্চিমী পুঁজির সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে উন্নয়নশীল বিশ্বকে লুন্ঠনে নেমে পড়ে। আফ্রিকার সুদান, কঙ্গোসহ প্রায় সবকটি দেশেই অপরিসীম লুন্ঠনের রাজত্ব কায়েম করে। উন্নয়নের পার্টনার হিসাবে অতীতে মার্কিনীরা দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিতে যা করেছে ঠিক তারই পুনরাবৃত্তি। চীনের এই নব্য শিকার এশিয়ার অনেক দেশ। অতীতের পশ্চিমা বিশ্বের  মতই অস্ত্র ব্যবসায় নেমে পড়েছে। দীর্ঘকাল পাকিস্তানের মত ধর্মীয় সংহিস রাষ্ট্রকে সমর্থন করে চীন। এদিকে ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করার লক্ষ্যে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে মাসুদকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হিসেবে  জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত সমর্থন করে।

ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনকে সামনে রেখে নিত্য নতুন ফন্দিতে ব্যস্ত। কখনো ভারতের মোদীকে বুকে জড়িয়ে ধরে মুসলিম ধর্মবিদ্বেষী হিসাবে নিজের পরিচিতি তুলে ধরছে। আবার চীনকে পারলে ইরানের মত সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসোবে ঘোষণা করার জন্য উদ্যত হওয়া। চীনের কাছ থেকে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের ধারকৃত প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ডলার যে কোন সময় আটকে দেওয়ার ফন্দিতে ব্যস্ত। যেমনটি করেছে নানান সময় পৃথিবীর নানা দেশের সাথে। বহু ডলার আটকে রেখেছে ইরানের।

পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট ধর্মীয় গোষ্ঠি ইহুদি জনগোষ্ঠিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ড জেরুজালেম দখল করে গত শতাব্দী থেকে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করতে ইসরাইল রাষ্ট্রটিকে সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসের মদদ দিয়ে চলেছে মার্কিন পুঁজিবাদ। আর এ কাজে সাথে পেয়েছে সৌদি রাষ্ট্রসহ মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকার দেশগুলোকে। মধ্যপ্রাচ্যের ওই দেশগুলোর রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখা হয়েছে পুঁজিবাদের স্বার্থে।

জাতিসংঘ নামক মোড়ল পৃথিবীর নানা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার গল্প নিয়ে নানান উপদেশ বিতরণ করে তখন মধ্যপ্রাচ্যের ওই অগণতান্ত্রিক রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর বিষয়ে বিস্ময়করভাবে নিরব থাকে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।