Home ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন বিজ্ঞানের আলোকে নামাযের বাতেনী ভেদ ও উপকারিতা

বিজ্ঞানের আলোকে নামাযের বাতেনী ভেদ ও উপকারিতা

।। হাফেজ মাওলানা নাজমুল হাসান ।।

ইসলামী শরীয়তে ধর্মের মূল ভিত্তি করা হয়েছে নামাযকে। যে নামায পড়ল না, বস্তুতঃ সে ধর্মই পালন করল না। ধর্মহীন অবস্থায় তার মৃত্যু হবে। নামাযই হলো আল্লাহর আনুগত্যের গুরুত্বপূর্ণ এক পরীক্ষা। এ প্রেক্ষিতে অনেকেই বলে থাকেন, আল্লাহ্ মহান দয়ালু, সময় অনেক পড়ে আছে, সংসারটা গুছিয়ে মেয়েগুলোকে বিয়ে দিয়ে ছেলেদের প্রতিষ্ঠিত করে সব ঝামেলা থেকে আগে মুক্ত হয়ে নিই। এরপর নিবিষ্ট মনে আল্লাহর ইবাদতে মানোযোগ দিব। আবার অনেকে বলে থাকেন, আরে ভাই জুমা’র নামায তো পড়ি, তাছাড়া সময় পেলে ওয়াক্তিয়া নামাযও তো আদায় করে থাকি মাঝে মধ্যে। শেষ বয়সে ঝামেলা মুক্ত হয়ে না হয় পুরোটাই পড়ব, আল্লাহ তাতেই বেহেশত দান করবেন, ইনশাআল্লাহ্।

আল্লাহ্ এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “তোমাদের সন্তানদেরকে সাত বছর বয়স হলে নামাযের তাগিদ দাও এবং দশ বছর বয়সে নামায পড়তে বাধ্য কর।”

এই নির্দেশ কি শুধু জান্নাত দানের জন্য না অন্য কোন রহস্য আছে এতে? সাধারণতঃ অধিকাংশ মুসলমান যারা নামায পড়েন, তারা দোযখ থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতের সুখ-শান্তি ভোগ করবে, এই আশাতেই নামায রোযা আদায় করে থাকেন।

আবার অনেক মানুষের ধারণা, মানুষকে নামায রোযা আদায় করতে বলা হয়েছে শুধুমাত্র আল্লাহর আনুগত্যের পরীক্ষা নেয়া এবং সেই পরীক্ষার ফলাফল দৃষ্টে জান্নাত অথবা জাহান্নামে প্রেরণের জন্য। হ্যাঁ, এ কথাও ঠিক, মানুষের ইবাদত-বান্দেগীর মাপকাঠিতে জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা সত্য, কিন্তু শুধুই কি তাই? শুধুই কি পারলৌকিক জীবনের লাভ-ক্ষতি নির্ণয় করার জন্যই ইবাদত-বন্দেগীর নীতিমালা তৈরী করা হয়েছে?

দেড় হাজার বছর আগে যখন বিজ্ঞান বা চিকিৎসা বিজ্ঞান ছিল না, তখন তৈরী হয় ইসলামী বিধি-বিধান। দেড় হাজার বছর গত হয়ে গেলেও সেই বিধি-বিধান বা নীতিমালা অপরিবর্তীতভাবে আজও বিরাজ করছে, কোন রদবদল হয়নি। এই দীর্ঘ দেড় হাজার বছরে দুনিয়ার বহু পরিবর্তন, পরিবর্ধন হয়ে গেছে।

পরিবর্তন হয়েছে দুনিয়ার মানুষেরাও। কিন্তু কুরআন-হাদীস ও ইসলামী বিধি-বিধানের একচুলও নড়চড় হয়নি। এর কারণ হলো, যিনি এ বিধানগুলি পাঠিয়েছেন, তিনি অনন্ত জ্ঞানের অধিকারী। সর্বকালের উপযোগী করেই বিধান রচিত হয়েছে; যা মানুষের পক্ষে অসাধ্য ব্যাপার। তাই তো দেখা যায়, আজ দেড় হাজার বছর পরে আধুনিক বিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিজ্ঞান রিচার্স গবেষণা করে সেই বিধানাবলীর তথ্য ও গুরুত্ব উদ্ঘাটন করে প্রমাণ করা হচ্ছে যে, ইসলামই একমাত্র ধর্ম; যা প্রেরিত হয়েছে ঊর্ধ্বাকাশ থেকে।

আমি বিজ্ঞানের উদ্ঘাটিত সেই তথ্যের কিছু বিষয় সংক্ষিপ্তাকারে পাঠকদের খিদমতে পেশ করব, ইনশাআল্লাহ্। এর আগে আমি মাসিক মুঈনুল ইসলামে “কুরআন-হাদীসের আলোকে ছেলে-মেয়েদের অধিকার” সম্বন্ধে আলোচনা করেছি। আজ নামায সম্বন্ধে কিছু আলোচনা করতে আশা রাখি, বাকী আল্লাহ্ তাআলার ইচ্ছা।

পাকিস্তানের প্রখ্যাত চিকিৎসক ও গবেষক ডা. মুহাম্মদ তারিক মাহমূদ দীর্ঘ পঁচিশ বছর রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের উপর এবং ফরয ওয়াজিব ইবাদত-বন্দেগীর উপর গবেষণা করে বিজ্ঞানের অবিস্কৃত ও তথ্যাদির ভিত্তিতে ‘সুন্নাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আধুনিক বিজ্ঞান’ নামে একটি সাড়া জাগানো গ্রন্থ রচনা করেছেন। আর এই মূল্যবান গ্রন্থটি অনুবাদ করেছেন শাইখুল হাদীস হাফেয মাওলানা হাবীবুর রহমান। উক্ত গ্রন্থটি পাঠ করে আমি অনেক অজানা বিষয় জানতে ও বুঝতে পারলাম। ইবাদত-বন্দেগী বা ইসলামী বিধান শুধু মানুষের পারলৌকিক জীবনের মঙ্গলের জন্য প্রণয়ন করা হয়নি। ইহকালীন জীবনের জন্যও তা এক মহাউপকারী চিকিৎসা, যে চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের দরকার হয় না, দরকার হয় না অর্থ ব্যয়ের।

নামায কেন দশ বছর বয়স থেকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে? প্রথমতঃ মানুষের শরীর সুস্থ্য রাখা, শক্তি বৃদ্ধি করা, শরীরকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য পৃথিবীতে যত রকম শরীর চর্চা বা ব্যয়াম করার নিয়ম নীতি ও আসন আবিস্কার হয়েছে, তার প্রায় সবগুলির সমন্বয় ঘটেছে নামাযে। সেদিক দিয়ে নামায মানুষের শরীর মন সুস্থ্য ও সবল রাখার এক মহাউপকারী উত্তম ঔষধ। কৈশোর বা যৌবনের প্রারম্ভ থেকে যে নিয়মিত নামায আদায় করবে, তাকে কোন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না, বা ঔষধ খেতে হবে না। অর্থাৎ কোন রোগই তাকে আক্রমণ করতে পারবে না। কারণগুলো নিম্নে বর্ণিত হল।

তার আগে আমরা জেনে নেব যে, আল্লাহ্ তাআলা কালামে পাকে কি ইরশাদ করেছেন। আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন, “আর আমি কুরআন মজিদে এমন সব জিনিস অবতীর্ণ করেছি, যেগুলো ঈমানদার লোকদের জন্য শিফা ও রহ্মত স্বরূপ।”

অযূর হাকীকত

নামায আদায় করার পূর্বে অযূ করতে হয়। আমরা অযূ দ্বারা শরীর পাক পবিত্র করাকেই সাধারণতঃ বুঝে থাকি এবং জেনেও আসছি। বিজ্ঞান বলছে, অযূ এমন একটি বিধান, যা ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্মে নেই। অযূর বৈশিষ্ট হলো, অযূ দ্বারা শরীরের যে অংশগুলি ধৌত বা পরিস্কার করা হয়, ঐ অংশগুলি দিয়েই শরীরের জন্য ক্ষতিকর বা দূষিত জীবাণু প্রবেশ করে।

এ কারণে শরীরের ঐ অংশগুলিই রোগ বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণের প্রধান মাধ্যম। তাই অযই হলো দেহে রোগ-ব্যধি প্রবেশের রাস্তা সমূহের অতন্দ্র প্রহরি, এর চেয়ে উত্তম প্রহরী পাওয়া দুষ্কর। অযূ করতে প্রথমে হাত ধৌত করতে হয়, তারপর মুখে পানি দিয়ে কুলি করতে হয়। হাত ধৌত না করে যদি মুখে পানি দেয়া হয়, তাহলে অপরিচ্ছন্ন হাতের রোগ জীবাণু পানির সাথে মিশ্রিত হয়ে মুখের ভিতর দিয়ে দেহাভ্যন্তরে প্রবেশকরে অসংখ্য ব্যধির জন্ম দিতে পারে। তাই প্রথমেই দু’হাত ধৌত করা হয়, যাতে রোগ জীবাণুগুলো পানির সাথে চলে গিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে। যার কারণে চর্ম রোগ, ঘামাচি, চর্মের জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

আরও পড়তে পারেন-

অযূর পূর্বে মিস্ওয়াক করা সুন্নাত। এই মিস্ওয়াককে আমরা শুধু সুন্নাত হিসেবে জেনে আসছি। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে মিস্ওয়াক ৮০ ভাগ রোগের প্রতিষেধক। কারণ, মানুষের দেহে ৮০% রোগের জন্ম হয় দাঁত থেকে। এই মিস্ওয়াকের উপকারিতা সম্বন্ধে গবেষণামলক স্বতন্ত্র অনেক গ্রন্থ বাজারে প্রকাশিত হয়েছে। যাতে মিস্ওয়াকের উপকারিতার উপর বিস্তর আলোচনা হয়েছে।

কুলির পরে নাকে পানি দিয়ে নাক পরিস্কার করতে বলা হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণের একমাত্র রাস্তা হলো নাক। যে বাতাস থেকে মানুষ শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে থাকে, তার মধ্যে বিচরণ করে থাকে অসংখ্য রোগ জীবাণু, যা মানব দেহে একমাত্র নাক দিয়েই প্রবেশ করে থাকে। তাই নাক যদি পরিষ্কার না থাকে তাহলে অনবরত রোগ-জীবাণুগুলো নিশ্বাসের সাথে ভিতরে প্রবেশ করে বিভিন্ন জটিল রোগের সৃষ্টি করে মানব দেহে মারাত্মক সব শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই নামাযের বদৌলতে দিনে পাঁচ বার অযর সময় নাক ধৌত করার কারণে এই ব্যধিগুলো থেকে আমরা রেহাই পেতে পারি। কারণ দিনে পাঁচবার নাক ধৌত করার কারণে কোন ক্রমেই রোগ জীবাণু নাকে আবদ্ধ হয়ে থাকতে পারে না।

অযর আরেকটি উপকার হলো, অযর মাধ্যমে উচ্চ রক্ত চাপ (হাই ব্লাড-প্রেসার) থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞান পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বলেছে, ব্লাড-প্রেসারের একজন রুগীকে প্রেসার মেপে নিয়ে তাকে উত্তম রূপে অযূ করিয়ে মাথা ও ঘাড় মাছেহ করার পর পুনঃ বার যদি প্রেসার মাপা হয়, তাহলে দেখা যাবে পূর্বের তুলনায় তার প্রেসার অনেক কমে গেছে। এ ছাড়া ‘আমেরিকান কাউন্সিল ফর বিউটি’ সংস্থার সদস্য লেপ হিচার বিস্ময়কর এক তথ্য উদ্ঘাটন করে বলেছেন, “মুসলিম সম্প্রদায়ের কোন প্রকার রাসায়নিক লোশন ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। তারা ইসলামী অযূ দ্বারা চেহারার যাবতীয় রোগ থেকে রক্ষা পেতে পারে।”

অযূ করতে কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করতে হয়। এর কারণ হলো, কনুই পর্যন্ত অংশটুকু থাকে সব সময় আবৃত। এ জায়গাসমূহে যদি পানি ও বাতাস না লাগে তাহলে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুবিক রোগের সম্ভাবন থাকে। কারণ, কনুইতে তিন প্রকার বৃহৎ শিরা থাকে, যা হৃৎপিন্ড, মস্তিষ্ক ও যকৃতের সাথে সমপৃক্ত। তাই কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করণে উপরোক্ত তিনটি অঙ্গের শক্তি সঞ্চার হয় এবং রোগ থেকে শরীরকে রক্ষা করে।

অযূতে মাথা মাসেহ করা হয়। এর উপকারীতা হল, দিনে পাঁচ বার অযূ করে যে ব্যক্তি মাথা ও ঘাড় মাসেহ করবে, তার কখনো মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটবে না। কারণ, এই মস্তিষ্ক থেকে কতিপয় সুক্ষ শিরা ঘাড়ের পৃষ্ঠ হয়ে সমস্ত শরীরে বিস্তৃত হয়ে পড়ে। তাই ঐ শিরা মাসেহ করে ভেজানো হলে শিরার শুষ্কতা দূরিভূত হয়ে তা আদ্র থাকে এবং উপরোক্ত রোগসমূহ প্রতিরোধ করে। এছাড়া একজন নামাযী ব্যক্তি যখন গর্দান মাছেহ্ করে, তখন হাতের সাহায্যে বৈদ্যুতিক রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়ে মেরুদন্ডে জমা হয় এবং মেরুদন্ডের হাড়কে স্বীয় গমন পথ বানিয়ে পুরো দেহের মাংস পেশী ও স্নায়ূতে ছড়িয়ে পড়ে। যদ্বারা মাংস পেশীসমূহে শক্তি সঞ্চারিত হয়।

অযূ করার সময় পা টাখনু পর্যন্ত ধৌত করার নিদের্শ দেয়া হয়েছে। এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো, ডায়াবেটিস রুগীদের পায়ে বেশী ইন্ফেকশনের ঝুঁকি থাকে। সুতরাং রুগী যদি আবরনী জুতা ব্যবহার করে, তাহলে রাস্তায় চলাচলের সময় ধলাবালির সাথে জুতার মধ্যে রোগ জীবাণুগুলো ঢুকে পায়ের আঙ্গুলের ফাঁকে আবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করে। আর ডায়াবেটিস রুগীর ক্ষত হলে সে ক্ষত সহজে ভাল হয় না।

তাই ইসলাম আমাদের জন্য দিনে পাঁচবার অযূর সময় পা ধৌত এবং পায়ের ও হাতের আঙ্গুলগুলোকে পানি দ্বারা উত্তম রূপে খেলাল করতে নির্দেশ দিয়েছে। আর এ নির্দেশগুলি দেয়া হয়েছে শুধু জান্নাত লাভের জন্য নয়, বান্দার দুনিয়ার জীবনে সুস্থ্য নিরাময় ও সবল দেহ নিয়ে যাতে সুখ শান্তিতে বসবাস করতে পারে তার জন্য।

হাদীস শরীফে আছে, অযূ করার পর যে পানি বেঁচে যায়, সেই পানি পান করলে রোগ মুক্তির কারণ হয়ে থাকে। এ সম্বন্ধে ডাঃ ফারুক আহমদ স্বীয় রিচার্সের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেন, “যে ব্যক্তি অযূর পর বেচে যাওয়া পানি পান করবে, সে নিম্নে বর্ণিত রোগ থেকে মুক্তি পাবে।

১। অবৈধ কামভাব খতম করতে খুবই পরীক্ষিত।
২। মূত্র থলিতে এর প্রভাবে অধিক পরিমান প্রস্রাব জমা হয় এবং প্রস্রাবের প্রতিবন্ধকতা হ্রাস পায়।
৩। প্রস্রাবের পর ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাব পড়া রোগ নির্মূল করে।
৪। হৃৎপিন্ড, পাকস্থলী এবং মত্র থলির উষ্ণতা ও শুষ্কতা বিদূরিত করে।

[আগামী কিস্তিতে সমাপ্য]

– হাফেজ মাওলানা নাজমুল হাসান, ভাইস প্রিন্সিপাল ও মুহাদ্দিস- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা-ঢাকা।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।