Home ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন আল্লাহর হুকুম পালনে সীমালঙ্ঘন করলে ধ্বংস অনিবার্য

আল্লাহর হুকুম পালনে সীমালঙ্ঘন করলে ধ্বংস অনিবার্য

- মুফতি জাকির হোসাইন কাসেমী। ছবি- উম্মাহ।

।। মুফতি জাকির হোসাইন কাসেমী ।।

মানুষ বিনা পুঁজিতে দুনিয়াতে এসেছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মাতা-পিতাকে মানব শিশুর দুনিয়াতে আসার মাধ্যম বানিয়েছেন। অতএব সঙ্গত কারণেই তিনি মানুষকে মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। যে সন্তান মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহারের শিক্ষায় দীক্ষিত হয়েছে, সে সন্তান মাতা-পিতার বন্ধু বা নিকটাত্মীয়দের সাথেও সদ্ব্যহার করবে। মাতা-পিতার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সমাজে।

মাতা-পিতা যদি সজ্জন হন, তাহলে সমাজে তাঁদের ইতিবাচক প্রভাব পড়া অনিবার্য। তেমনি মাতা-পিতার সন্তান সমাজের প্রতিও থাকবে কমিটেড, এমন আশা সঙ্গত। সমাজের নিরাপত্তা, শৃংখলা ও ঐক্য বিঘ্নিত করে জীবনকে ধারণ করা যায়, যাপন করা যায় না। তখন জীবিতরা মৃতদের ঈর্ষা করতে থাকে। ইহকালকে সুন্দর করার প্রার্থনা আল্লাহ নিজেই মেহেরবানী করে শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে- অবশ্য পরকালীন কল্যাণকে বিস্মৃত না হয়েই। বুঝতে কষ্ট হয় না যে, দুনিয়াকে অসুন্দর করে তোলা আল্লাহর অভিপ্রায়ের বিপরীত।

আল্লাহর অভিপ্রায়ের বিরোধীতা করে কোন ব্যক্তি নিস্তার পায়নি। কোন জাতিও পায়নি নিরাপত্তা। যে ব্যক্তি সমাজ, রাষ্ট্র বা জাতি আল্লাহর অভিপ্রায়ের বিপরীত দিকে পদযাত্রা করেছে, তারা কখনও গন্তব্যে পৌঁছেনি। বরং কারুণের মত পাতালের দিকে তাদের নির্গমন ঘটেছে। শাদ্দাদের মত ডান পা ঢুকিয়ে বাম পা তোলার আগেই মৃত্যু এসে তাদের ঔদ্ধত্যকে মিসমার করে দিয়েছে।

যুগে যুগে নবী-রাসূল আলাইহিস্ সালামগণ আল্লাহর অভিপ্রায়কে মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন। তিনটি শ্রেণী প্রায় সব সময় নবী-রাসূলদের এ মিশনের সক্রিয় বিরোধীতা করেছে। তন্মধ্যে একটা হচ্ছে- ক্ষমতাধর রাষ্ট্রীয় শক্তি, দ্বিতীয় হচ্ছে অগ্রসরমান বুদ্ধিজীবী শ্রেণী, তৃতীয় হচ্ছে ঈর্ষাপরায়ণ যাজক শ্রেণী। রাষ্ট্র শক্তি ক্ষমতা হারানোর ভয়ে, বুদ্ধিজীবী শ্রেণী নৈতিক স্খলনের পথ রুদ্ধ হবার ভয়ে, যাজক শ্রেণী সম্মান ও প্রতিপত্তি হারানোর ভয়ে কোমর বেঁধে এসবের বিরাধীতা করেছে।

আরও পড়তে পারেন-

কিন্তু তারা আল্লাহর অভিপ্রায়কে ব্যর্থ করতে পারেনি। সাময়িক বিজয়ে তারা উজ্জীবিত হলেও চূড়ান্ত পরাজয়ে হয়েছে নিশ্চিহ্ন। চারিদিকে মাকড়সার মত তারা পেতেছে মিথ্যা প্ররোচণা ও প্রচারণার জাল, কিন্তু তাদের নির্মিত মোহজাল ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে অবশেষে। কারণ, নির্মিত ঘরসমূহের মধ্যে মাকড়সার ঘরই সবচেয়ে ক্ষণভঙ্গুর। তাদের কৌশল মাঝে মাঝে সাফল্য লাভ করলেও তা কিন্তু পরবর্তীতে পরাজয়ে পর্যবসিত হয়েছে। কেননা, শয়তানের কৌশল সবচেয়ে দুর্বল।

আল্লাহর নৈতিক বিধানকে তারা অস্বীকার, অবজ্ঞা ও অমান্য করেছে। কিন্তু তাঁর প্রাকৃতিক বিধানকে তারা অগ্রাহ্য করতে পারেনি। যেমন- তারা বার্ধক্যকে রোধ করতে পারেনি, মৃত্যুকেও পারেনি এড়িয়ে যেতে। শারীরিক নিয়ম ভঙ্গ করে তারা স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারেনি। পানির শীতলতা ও আগুনের দাহ্যতাকেও তারা অস্বীকার করতে পারেনি। আল্লাহর নূরকে তারা ফুঁৎকারে নিভিয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু তিনি তাদের মর্মজ্বালার প্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে তাঁর নূরের পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়েছেন।

আল্লাহর নৈতিক জীবন বিধানকে অগ্রাহ্য করার সাহস তারা পেয়েছে আল্লাহ প্রদত্ত স্বাধীনতার অসদ্ব্যবহার করে। আল্লাহ প্রদত্ত নগদ দুনিয়াকে তারা গ্রহণ করেছে- শুধু গ্রহণ করেনি নিয়ম-রীতি মেনে। লুটেরার মনোবৃত্তিতে তা ভোগ করেছে কিন্তু একই আল্লাহ প্রদত্ত পেন্ডিং আখিরাতকে তারা গ্রহণ করেনি। অথচ দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী আখিরাত চিরস্থায়ী। ক্ষণস্থায়ী সুখের মোহে চিরস্থায়ী আখিরাতকে অগ্রাহ্য করে তারা সুবুদ্ধির পরিচয় দেয়নি। বরং তারা ডেকে এনেছে নিজেদের সমূহ সর্বনাশ। তারা বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে ছোট-বড় যুদ্ধ-বিগ্রহসহ দু’দুটি সভ্যতা বিধ্বংসী মহাযুদ্ধ ঘটিয়েছে। যুদ্ধ শেষে বিধ্বস্ত পৃথিবীর জন্য মায়াকান্না কেঁদেছে এবং যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন কর্মের নামে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডারে পুনরায় বিধ্বংসী সব অস্ত্রের সম্ভার গড়ে তুলেছে। জীবনের সাথে, দুনিয়ার সাথে, মানুষের সাথে তারা কি ধরনের অসদ্ব্যবহার করেছে এগুলো তার জ্বলন্ত প্রমাণ। আপন গৃহে তারা সদ্ব্যবহার চর্চা করেনি। সংসারে জ্বালিয়েছে অশান্তির আগুন, সে আগুন তারা লাগিয়েছে সমাজের দেহে। রাষ্ট্রকে সে অগ্নিশিখায় পুড়িয়েছে, দুনিয়াকে করেছে ছারখার।

চিরন্তন আল্লাহর সতর্কবাণীকে অগ্রাহ্য করে তারা নির্মাণ করেছে ভোগবাদ, শিরক ও অগণিত গুনাহের সাগরে ডুব দিয়েছে। তাওহীদের অমোঘ ধারণাকে অগ্রাহ্য করে শিরকে দিয়েছে প্রশ্রয়। ভাবমূর্তি সৃষ্টির এবং মেকী প্রত্যাশায় তারা অসংখ্য মূর্তির সৃষ্টি করেছে এবং এভাবেই চিরস্থায়িত্বের স্বপ্নাকাঙ্খায় মনকে ভরপুর করেছে। শারীয়তের বিধানকে অগ্রাহ্য করে তারা স্বাস্থ্যের জন্য উদগ্রীব হয়েছে। দৈহিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তারা নানাবিধ বিধি ও উপদেশে নিজেদের বিদ্ধ করেছে। কিন্তু নৈতিক শৃংখলাকে অগ্রাহ্য করে তারা আত্মার যে ক্ষতি সাধন করেছে, তার প্রতি নজর দেয়ার ফুরসত পায়নি। অথচ দেহ ও আত্মার সমন্বয়েই মানুষ। দেহের সামনে সে ভোগের বিচিত্র সামগ্রীর অঢেল পশরা মেলে ধরেছে। অথচ আত্মার রসদ কি, তার তালাশও করেনি।

মানুষের বিপথগামী হবার আশংকাকে সামনে রেখেই আল্লাহ তার জন্য চলার পথের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। নিষ্কলুষ আত্মা সহকারে তাঁর কাছে ফিরে পাবার প্রত্যাশায় আল্লাহ যুগে যুগে আসমানী ওহীর মাধ্যমে আপন অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। পবিত্র কুরআন আল্লাহর সে মহান অভিপ্রায়কে ধারণ করে আছে। কুরআনে ধারণকৃত আল্লাহর অভিপ্রায়কে উপলব্ধি করার জন্য জ্ঞানী ও চিন্তাশীলদের প্রতি আল্লাহ তাআলা বারং বার আহ্বান জানিয়েছেন।

আসমানী এ আহ্বান যদি না নাযিল হত, তবে দুনিয়ার মানুষ হয়ে পড়ত। অসহায় মযলুম আর রহমতের এ উদাত্ত আহ্বানের প্রতি সাড়া না দিয়ে মানুষ হয়ে পড়েছে স্বেচ্ছাচারী যালিম।

লেখকঃ মুহাদ্দিস- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা ঢাকা, খতীব- তিস্তা গেট জামে মসজিদ টঙ্গী, গাজীপুর, উপদেষ্টা- উম্মাহ ২৪ ডট কম এবং কেন্দ্রীয় অর্থসম্পাদক- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। ই-মেইল- [email protected]

উম্মাহ২৪ডটকম:

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।