Home ফিকহ ও মাসায়েল সাদকায়ে ফিতরের মাসাইল

সাদকায়ে ফিতরের মাসাইল

।। আল্লামা মুফতি নূর আহমদ ।।

‘ফিতর’ শব্দের অর্থ রোযা খোলা বা রোযা ত্যাগ করা। আল্লাহ্ তাআলা স্বীয় বান্দাদের উপর একটি সাদকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা রমযান শরীফ শেষ হওয়ার পর রোযা খোলার (অর্থাৎ রোযা শেষ হওয়ার) খুশী এবং শুকরিয়া হিসেবে আদায় করতে হয়। একে সাদকায়ে ফিতর বলা হয় এবং রোযা খোলার খুশী পালনের দিন হওয়ার কারণেই রমযান শেষের ঈদকে ঈদুল ফিতর বলা হয়।

হযরত ইব্নে আব্বাস (রাযি.) বলেন, রোযাকে অশ্লীল এবং অনর্থক কথাবার্তা থেকে পাকপবিত্র করার জন্য এবং দুঃস্থ-অসহায়-গরীবদের জীবিকা হিসেবে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) সদকায়ে ফিতরকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। (আবুদাঊদ, মিশ্কাত)।

ফিতরা দেওয়ার উপকারিতা হল, এতে রোযা পাকপবিত্র হয়ে আল্লাহ্ তাআলার নিকট কবুল হওয়ার উপযুক্ত হয়। ফিতরা প্রদান করা দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্য অর্জন, কবরের আযাব ও মৃত্যুর কষ্ট হতে মুক্তির উপায়ও বটে। (তাহ্তাবী-৩৯৫)।

ফিতরা দেওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ওয়াজিব নয় বরং যে মুসলমান এই পরিমাণ সম্পদের মালিক যে, তার উপর যাকাত ফরয অথবা যাকাত ফরয নয় কিন্তু প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের অতিরিক্ত এ পরিমাণ মূল্যের সম্পদ ও আসবাবপত্র আছে, যে মূল্যের উপর যাকাত ফরয হতে পারে, তাহলে ঐ ব্যক্তির উপর ঈদের দিন এই ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব। চাই এটা ব্যবসার মাল হোক বা না হোক, স্বর্ণ-রৌপ্য হোক বা না হোক, চাই বছর পূর্ণ হোক বা না হোক। (মারাক্বিউল ফালাহ্, তাহ্তাবী)।

কোন ব্যক্তির কাছে যদি ব্যবহারের কাপড় ছাড়া অতিরিক্ত কাপড় থাকে বা দৈনন্দিন প্রয়োজনের অধিক পিতল, তামা, চিনামাটি ইত্যাদি পাত্র অথবা অতিরিক্ত কোন ঘর খালি পড়ে থাকে অথবা এ ধরনের অন্য যে কোন প্রকারের আসবাবপত্র মৌলিক প্রয়োজনাতিরিক্ত থাকে যেগুলোর মূল্য যাকাতের নিসাবের সমান হয় অথবা বেশী হয়, তাহলে যদিও ঐ ব্যক্তির উপর যাকাত ফরয নয়, কিন্তু ফিতরা ওয়াজিব। (তাহ্তাবী-৩৯৫, হিন্দিয়া)।

প্রত্যেক সাহেবে নিসাব ব্যক্তির উপর তার নিজের পক্ষ থেকে এবং তার নাবালক দরিদ্র সন্তানের পক্ষ থেকে ফিত্রা আদায় করা ওয়াজিব কিন্তু নাবালকের যদি নিসাব পরিমাণ নিজস্ব সম্পদ থাকে, তাহলে তার ফিতরা তার সম্পদ থেকে আদায় করতে হবে। (মারাক্বিউল ফালাহ্, তাহ্তাবী-৩৯৪)।

ঈদের দিন সুব্হে সাদিক হওয়ার সাথে সাথেই এই সাদকা ওয়াজিব হয়। অতএব, যে ব্যক্তি সুব্হে সাদিকের পূর্বে ইন্তিকাল করে তার সম্পদ থেকে তার জন্য সাদকায়ে ফিতরা দিতে হবে না এবং যে সন্তান সুব্হে সাদিকের পূর্বে জন্ম নিয়েছে তার পক্ষ থেকে ফিত্রা আদায় করতে হবে এবং যদি ঈদের দিন সুব্হে সাদিকের পরে কেউ মুসলমান হয় অথবা কোন বাচ্চা জন্মগ্রহণ করে, তাহলে তার উপর সাদকায়ে ফিতরা ওয়াজিব নয়। (মারাক্বিউল ফালাহ্, তাহ্তাবী-৩৯৫)।

ঈদের দিন নামাযে যাওয়ার পূর্বে ফিতরা আদায় করে দেওয়া উত্তম। যদি নামাযের পরে অথবা ঈদের দিনের পূর্বেই আদায় করে দেয়, তাহলেও অসুবিধা নেই। বস্তুতঃ যাদের উপর ফিতরা ওয়াজিব, যতক্ষণ পর্যন্ত আদায় না করবে ওয়াজিব থেকে যাবে, মাফ হবে না। যদিও কোন কারণবশতঃ রোযা না রাখে। (মারাক্বিউল ফালাহ্, তাহ্তাবী, হিন্দিয়্যা)।

আরও পড়তে পারেন-

ফিতরার পরিমাণঃ সাদকায়ে ফিতরা প্রত্যেক প্রকারের শস্য বা তার মূল্য দিয়ে দেওয়া জায়েয। যদি গম বা গমের আটা বা ছাতু দেয়, তবে প্রত্যেকের ফিতরা বাবদ পৌনে দু’সের করে দিতে হবে। বরং সাবধানতা হিসেবে দু’সের দেওয়াই উত্তম। আর যদি যব (ভুট্টা জাতীয় শস্য বিশেষ) বা যবের আটা বা ছাতু দেয়, তবে সাড়ে তিন সের দিতে হবে। যদি যব এবং গম ছাড়া অন্য কোন শস্য দ্বারা ফিতরা দেয়, যেমন- ধান, চাল, ডাল ইত্যাদি, তবে পৌনে দু’সের গমের মূল্য অথবা সাড়ে তিন সের যবের মূল্যে যে পরিমাণ সেসব শস্য পাওয়া যায়, তা-ই দিতে হবে। আর যদি মূল্য দিয়ে দেয়, তবে পৌনে দু’সের গম বা সাড়ে তিন সের যবের যে মূল্য আসে তাই দিতে হবে। (মারাক্বিউল ফালাহ্, তাহ্তাবী, হিন্দিয়্যা, শামী)।

যেসব লোকদেরকে যাকাত দেওয়া জায়েয তাদেরকে সাদকায়ে ফিতরা দেওয়াও জায়েয এবং যাদেরকে যাকাত দেওয়া জায়েয নয় তাদেরকে সাদকায়ে ফিতরা দেওয়াও নাজায়েয। (তাহ্তাবী-৩৯৩ পৃঃ, শামী)।

ইমাম ও মুয়াযযিনকে নিয়োগ দানের সময় যদি আযান ও ইমামতির বেতনের মধ্যে ফিতরা দেওয়ারও শর্ত করা হয় যে, প্রতি বছর সাদকায়ে ফিতরাও দেওয়া হবে, তবে এরূপ শর্ত করে তাদেরকে ফিতরা দিলে আদায় হবে না। যদি এরূপ করা হয়ে থাকে, তাহলে পুনরায় ফিতরা আদায় করতে হবে। তবে কোন প্রকার শর্ত না করে যদি গরীব হওয়ার কারণে তাদেরকে দেওয়া হয়, তাহলে কোন অসুবিধা নেই। কোথাও যদি শর্ত করা না হলেও এরূপ প্রচলিত থাকে যে, এখানে ইমাম-মুয়াযযিনকে বেতনের বদলায় ফিতরা দেওয়া হয়, তাহলে তাদেরকে নিয়োগ দেওয়ার সময় কথাটা পরিস্কার করে নিতে হবে যে, তাদেরকে বেতন হিসেবে সাদকায়ে ফিতরা দেওয়া হবে না। যাকাতের ব্যাপারেও একই হুকুম। (যাওয়ালুচ্ছিনাহ্)।

একজনের ফিতরা একই ব্যক্তিকে অথবা অল্প অল্প করে কয়েক ব্যক্তিকে দেওয়া জায়েয। অনুরূপভাবে কয়েকজনের ফিতরা একই ব্যক্তিকে দেওয়াও জায়েয। (দুররে মুখ্তার, রদ্দুল মুহ্তার-২/১২৫)।

গম, যব ইত্যাদির বাজার দর বা সরকারী দর হিসেবে দেওয়াও জায়েয। অবশ্য যে হিসেবে মূল্য বেশী হয় সে হিসেবে দেওয়াই উত্তম এবং পরহেযগারী। (মুঈনুল মুফ্তী ওয়াচ্ছাইল)।

– আল্লামা মুফতি নূর আহমদ, প্রবীণ মুফতি ও মুহাদ্দিস- দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম-হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।