।। মোবাশ্বিরা হাবিবা ।।
ইসলাম এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা নারীজাতিকে পরিবার ও সমাজে এক অনন্য মর্যাদা ও আলোকোজ্জ্বল স্থান দিয়েছে। ইসলাম-পূর্ব যুগে নারীরা ছিল চরমভাবে অবহেলিত। তাদের প্রতি যে নিষ্ঠুরতম আচরণ করা হতো, বিশেষ করে কন্যা-সন্তানদের জীবন্ত কবরস্থ করার মতো বর্বরোচিত প্রথা, তা ইতিহাসের পাতায় অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে পরিচিত। সেই প্রেক্ষাপটে ইসলাম নারীকে দিয়েছে অভূতপূর্ব সম্মান ও অধিকার।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু হাদীসে নারীর এই মর্যাদা স্পষ্ট হয়েছে। যেমন-
- যার তিনটি কন্যা-সন্তান বা তিনটি বোন থাকে অথবা দুটো কন্যা বা বোন থাকে, আর সে তাঁদেরকে সঠিকভাবে লালন-পালন করে এবং তাঁদের ব্যাপারে আল্লাহর ভয় রেখে কাজ করে, তার বিনিময়ে সে জান্নাতে পৌঁছে যাবে। (সহীহ্ তিরমিযী)।
- উকবা ইবনে আমার (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি: যার তিনটি কন্যা-সন্তান আছে এবং সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করে এবং তাদেরকে যথাসাধ্য উত্তম পোশাকাদি দেয়, তারা তার জন্য দোযখ থেকে রক্ষাকারী প্রতিবন্ধক হবে। (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)।
- ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজী (সা.) বলেন: যে মুসলিমের দুইটি কন্যা সন্তান আছে এবং সে তাদেরকে উত্তম সাহচর্য দান করে তারা তাকে বেহেশতে দাখিল করবে। (ইবনে মাজাহ, হাকিম)।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমান যুগেও আমরা নারী নির্যাতনের চিত্র দেখতে পাই। রাস্তা-ঘাটে, হাটবাজারে, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নারীদের হেনস্থা করা হচ্ছে। অথচ নবীজী (সা.) নারীদের কেবল সম্মানই দেননি, তাদের শিক্ষার প্রতিও বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি নারীদের জন্য সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে শিক্ষার ব্যবস্থা করতেন।
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
হাদীসে এসেছে, এক নারী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনার বাণী তো কেবল পুরুষেরা শুনতে পান। সুতরাং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য এক দিন নির্ধারণ করে দিন, যেদিন আমরা আপনার কাছে আসব। আল্লাহ আপনাকে যা কিছু শিক্ষা দিয়েছেন, তা থেকে আপনি আমাদের শিক্ষা দেবেন।’ নবীজী (সা.) তাদের জন্য একটি দিন নির্ধারণ করে দিলেন এবং আল্লাহ তাঁকে যা কিছু শিক্ষা দিয়েছেন, তা থেকে তাদের শিক্ষা দিলেন। (সহীহ্ বুখারী)।
নারীর প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব দিয়ে নবীজী (সা.) গুরুত্বের সঙ্গে নির্দেশ দিয়েছেন- “আমি তোমাদেরকে গুরুত্বের সঙ্গে নির্দেশ দিচ্ছি যে, নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার। তোমরা আমার এই নির্দেশ গ্রহণ কর।”
নারীর প্রতি সদ্ব্যবহারের পাশাপাশি ঘরোয়া কাজেও রাসূল (সা.)-এর ভূমিকা ছিল অনুকরণীয়। আয়েশা (রাযি.)কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘরের মধ্যে কী কাজ করতেন? উত্তরে তিনি বলেন- ‘তিনি অন্যান্য মানুষের মতোই একজন ছিলেন। নিজের কাপড়ের উকুন পরিষ্কার করতেন, বকরির দুধ দোহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজেই করতেন।’ (মুসনাদে আহমদ)।
অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি স্বীয় কাপড় নিজেই সেলাই করতেন; নিজের জুতা নিজেই ঠিক করতেন এবং সাধারণ মানুষের মতোই ঘরের কাজকর্ম করতেন। (মুসনাদে আহমদ)
নারীদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে নবীজী (সা.)-এর কোমলতা ও সদ্ব্যবহার ছিল দৃষ্টান্তমূলক। আয়েশা (রাযি.) বলেন: “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো তাঁর কোনো খাদেমকে অথবা তাঁর কোনো স্ত্রীকে মারধর করেন নি এবং নিজ হাতে অপর কাউকেও প্রহার করেন নি।” (ইবনে মাজাহ্)।
আজ যদি আমরা ইসলামের আলোকে নারীদের প্রাপ্য সম্মান দিতে পারতাম এবং তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে জানতাম, তবে নারীরা সমাজে অবহেলার পাত্র হতেন না, তুচ্ছতম আচরণের শিকারও হতেন না। কুরআন-হাদীসের সঠিক জ্ঞান না থাকাই এর মূল কারণ। নারীদের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করতে হবে, কীভাবে শিক্ষা দিতে হবে, ভুলের জন্য কখন শুধু নসিহার মাধ্যমে বোঝাতে হবে আর কখন শাসন (যা কখনোই মারধর নয়, বরং শুধরানোর উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায়) করতে হবে—এসবের সঠিক দিকনির্দেশনা ইসলামেই রয়েছে।
আসুন, আমরা নবীজী (সা.)-এর আদর্শকে অনুসরণ করে নারী সমাজকে তাদের প্রাপ্য মর্যাদা, শিক্ষা ও সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করি। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে সঠিক বোঝ দান করুন।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








