।। মাওলানা সাকিব আমজাদ জমিরী ।।
ইসলামী বর্ষপঞ্জির আবর্তনে রজব মাস আমাদের দ্বারে উপস্থিত। এই মাসটি মুমিনের হৃদয়ে রমজানের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। মুসলিম সমাজে রজব মাসকে ঘিরে যেমন আবেগ রয়েছে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে কিতাব ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান না থাকায় নানা প্রথা ও বিশেষ আমলের প্রচলনও লক্ষ্য করা যায়। তবে একজন সচেতন মুসলিমের জন্য যে কোনো আমলের পূর্বে তার শরয়ী ভিত্তি ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা ঈমানি দায়িত্ব। এই নিবন্ধে আমরা কুরআন, সহীহ হাদীস এবং প্রাজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের নির্দেশনার আলোকে রজব মাসের প্রকৃত মর্যাদা ও আমলের সীমারেখা নিয়ে আলোকপাত করব, ইনশাআল্লাহ।
১. রজব মাসে বিশেষ আমল: শরীয়তের মানদণ্ড
শরীয়তের মূলনীতি হলো—ইবাদত তখনি গ্রহণযোগ্য হয় যখন তা নবী করীম (সা.)-এর সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত হয়। রজব মাসকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোনো নামায, বিশেষ কোনো রোযা বা নির্দিষ্ট কোনো গাণিতিক আমলের নির্দেশনা সহীহভাবে প্রমাণিত নয়।
বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম ইবনু হাজর আল-আসকালানী (রহ.) অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন:
“রজব মাসের ফযীলত, এর রোযা কিংবা এর কোনো নির্দিষ্ট রাতে বিশেষ নামায সম্পর্কে কোনো সহীহ বা গ্রহণযোগ্য হাদীস প্রমাণিত নেই।” (তাবইয়ীনুল আজব বিমা ওয়ারাদা ফি ফাদলির রজব, পৃষ্ঠা: ১১)
অতএব, প্রচলিত ‘সালাতুর রাগায়েব’ বা নির্দিষ্ট সংখ্যক রোযার যে ফযীলত বর্ণনা করা হয়, মুহাদ্দিসগণের সূক্ষ্ম বিচারে সেগুলো হয় জাল (মাওযূ‘), না হয় অত্যন্ত দুর্বল ও ভিত্তিহীন।
২. সালাতুর রাগায়েব: একটি তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ
রজব মাসের প্রথম জুমুআর রাতে ‘সালাতুর রাগায়েব’ নামক বিশেষ নামাযের ব্যাপক প্রচলন কিছু সমাজে দেখা যায়। অথচ ইলমে হাদীসের ইমামগণ একে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন- “সালাতুর রাগায়েব একটি নিকৃষ্ট বিদআত। এর সপক্ষে বর্ণিত হাদীসটি সম্পূর্ণ জাল।” (আল-মাজমূ‘ শরহুল মুহাজ্জাব, খণ্ড: ৩)।
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
একইভাবে ইবনুল জাওযী (রহ.) একে তাঁর বিখ্যাত ‘আল-মাওযূ‘আত’ গ্রন্থে জাল হাদীস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ধর্মের নামে নতুন কোনো কিছু উদ্ভাবন করা সওয়াবের পরিবর্তে গোনাহের কারণ হতে পারে, যা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।
৩. রজব মাসের মর্যাদা: ‘আশহুরে হুরুম’ বা সম্মানিত মাস
রজবের কোনো নির্দিষ্ট দিনের বিশেষ ইবাদত প্রমাণিত না হলেও, এই মাসের সামগ্রিক মর্যাদা কুরআন দ্বারা সুনিশ্চিত। এটি চারটি ‘হারাম’ বা বিশেষ সম্মানিত মাসের অন্যতম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা বারোটি… তার মধ্যে চারটি হচ্ছে হারাম (সম্মানিত)।” (সূরা আত-তাওবা: ৩৬)।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বিদায় হজ্জের ভাষণে চার মাসের নাম উল্লেখ করেছেন: যিলকদ, যিলহজ্জ, মুহাররম এবং রজব। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৪৬৬২)।
এই মাসগুলোর বিশেষত্ব হলো—এ সময়ে গুনাহের ভয়াবহতা যেমন বেশি, নেক আমলের গুরুত্বও তেমনি অপরিসীম। তাই এই মাসে পাপাচার বর্জন করে তাকওয়া অর্জনের সাধনা করা ইসলামের প্রকৃত দাবি।
৪. রজব মাসে অনুমোদিত আমল ও আত্মশুদ্ধি
রজব মাসে এমন কোনো আমল করা যাবে না যাকে শরীয়ত নির্ধারিত ‘বিশেষ’ কিছু মনে করা হয়। তবে সাধারণ নফল আমল যা সারা বছর করা যায়, তা রজব মাসেও অত্যন্ত বরকতময়। যেমন-
- সাধারণ নফল রোযা: আইয়ামে বিয (১৩, ১৪, ১৫ তারিখ) বা সোমবার ও বৃহস্পতিবারের নিয়মিত সুন্নাহ রোযা রাখা।
- কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির: মহান আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশি বেশি তিলাওয়াত ও ইস্তিগফার করা।
- আত্মশুদ্ধি: রমজানের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নিজের আখলাক ও আমলের ত্রুটিগুলো সংশোধন করা।
ইমাম ইবনু রজব আল-হাম্বলী (রহ.) চমৎকার বলেছেন- “রজব মাসে নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত নেই; তবে এটি মূলত আত্মশুদ্ধির একটি উত্তম প্রহর।” (লাতায়িফুল মা‘আরিফ, পৃষ্ঠা: ২১৪)
৫. রজব ও শা‘বান: রমজানের প্রবেশদ্বার
সালাফে সালেহীন বা আমাদের পূর্বসূরি পুণ্যবানগণ রজব মাস থেকেই রমজানের আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি শুরু করতেন। তাঁরা একে কোনো বিদআতী রসমের মাধ্যমে নয়, বরং ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে উদযাপন করতেন। একটি প্রসিদ্ধ প্রাজ্ঞোক্তি রয়েছে:
“রজব হলো বীজ বপনের মাস, শা‘বান পরিচর্যার মাস আর রমজান হলো ফসল কাটার মাস।” অর্থাৎ, রমজানের রহমত ও মাগফিরাত পেতে হলে রজব থেকেই মনের জমিন প্রস্তুত করতে হবে।
উপসংহার: রজব মাস সম্পর্কে শরীয়তের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো—এ মাসকে হারাম মাস হিসেবে সম্মান করা এবং কোনো প্রকার বিদআত বা মনগড়া আমল থেকে মুক্ত থেকে সুন্নাহভিত্তিক জীবনযাপন করা। রমজানের পূর্ণ বরকত লাভের জন্য এখন থেকেই তাওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে নিজেকে ধুয়েমুছে সাফ করাই হোক আমাদের লক্ষ্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন এবং সহীহ দলীল অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দিন। আমীন।
লেখক: মাওলানা সাকিব আমজাদ জমিরী, শিক্ষক, আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








