বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসার কেন্দ্রীয় মসজিদ জামে বায়তুল কারীমে পবিত্র রমযানের আখেরী দশকের ইতিকাফ শুরু হয়েছে। এ বছর মাদ্রাসাটির কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রায় সহস্রাধিক রোযাদার ইতিকাফে বসেছেন। ইতিকাফের প্রথম দিন আজ বুধবার (১১ মার্চ) বাদ যোহর মুতাকিফীনদের উদ্দেশে বিশেষ হিদায়াতী বয়ান করেন দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসার মুহাদ্দিস হযরত আল্লামা মুফতি জসিমুদ্দীন (দা.বা.)। প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী চলা এ বয়ানে তিনি রমযানের শেষ দশকের তাৎপর্য, ইতিকাফের মর্যাদা, লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান এবং এ সময়ের করণীয় আমল সম্পর্কে বিশদ দিকনির্দেশনা দেন। এ সময় মুতাকিফীনরা গভীর মনোযোগের সঙ্গে তাঁর বয়ান শোনেন।
দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসা সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছরের মতো এবারও রমযানের আখেরী দশকে বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসল্লি মাদ্রাসার কেন্দ্রীয় মসজিদে ইতিকাফে অংশ নিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত আলেম, ছাত্র, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও সাধারণ রোযাদারদের অংশগ্রহণে মসজিদজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক অনন্য ইবাদতী পরিবেশ। রমযানের শেষ দশককে ঘিরে মসজিদে বিশেষভাবে কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামায, যিকির-আযকার, দোয়া-ইস্তিগফার এবং শবে কদর তালাশের আমেজ বিরাজ করছে। মাদ্রাসার পক্ষ থেকে মুতাকিফীনদের জন্য ইফতারী, সন্ধ্যার খাবার ও সাহরীর আয়োজন করা হয়।
ইতিকাফের প্রথম দিন আজ (১১ মার্চ) বুধবার বাদ যোহর হিদায়াতী বয়ানে আল্লামা মুফতি জসিমুদ্দীন বলেন, ইসলামের মৌলিক পাঁচটি ভিত্তির অন্যতম হচ্ছে রমযানের রোযা। হিজরী বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় মাহে রমযান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মাস। রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের অপরূপ সমাহার নিয়ে এ মাস প্রতি বছর মুমিনের জীবনে আসে। ঈমানদার বান্দার জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের এটি এক বিরাট সুযোগ। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, রমযানের আগমন উপলক্ষে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। তিনি বলেন, এ মাসের প্রতিটি রাতেই অসংখ্য বান্দা জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে; সুতরাং রমযানের প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান, আর শেষ দশক তো বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ।
তিনি বলেন, রমযানের শেষ দশক আল্লাহর ইবাদতে সর্বাধিক মনোনিবেশের সময়। এ দশকেই রাসূলুল্লাহ (সা.) ইবাদত-বন্দেগীতে অধিক পরিশ্রম করতেন, পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন এবং নিজে ইতিকাফে বসতেন। একই সঙ্গে এ সময়েই রয়েছে হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রজনী—লাইলাতুল কদর। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) রমযানের শেষ দশকে এমন মেহনত করতেন, যা অন্য কোনো সময় করতেন না। আরেক বর্ণনায় এসেছে, তিনি এ সময় কোমর বেঁধে ইবাদতে লেগে যেতেন, রাত জাগতেন এবং পরিবারের সদস্যদেরও ইবাদতের জন্য জাগিয়ে দিতেন।
বক্তব্যে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন নিষ্পাপ, তাঁর পূর্বাপর সব ত্রুটি আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। তারপরও যদি তাঁর শেষ দশকের আমল এত বেশি হয়, তাহলে আমাদের মতো গুনাহগার বান্দার জন্য এ সময়ের গুরুত্ব কত গভীর হওয়া উচিত—তা অনুধাবন করা জরুরি। আখেরাতের অফুরন্ত সফলতা এবং রমযানের সৌভাগ্য পেতে হলে নবীজির দেখানো পথেই চলতে হবে।
রমযানের শেষ দশকের বিশেষ দুইটি আমলের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথমটি হলো ইতিকাফ, দ্বিতীয়টি লাইলাতুল কদর তালাশ।
ইতিকাফ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি মহান আল্লাহর দরবারে আশ্রয় গ্রহণের এক অনন্য রূপ। বান্দা যখন মসজিদে অবস্থান করে নিজেকে দুনিয়ার কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহর দিকে একাগ্র হয়, তখন তার অন্তর পরিশুদ্ধ হয়, আত্মশুদ্ধি অর্জিত হয় এবং ইবাদতে এক বিশেষ মনোসংযোগ সৃষ্টি হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) রমযানের শেষ দশকে নিয়মিত ইতিকাফ করতেন—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাদীসের বহু বর্ণনায় প্রমাণিত হয়েছে যে, নবীজি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন। যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর তিনি বিশ দিন ইতিকাফ করেছিলেন।
তিনি বলেন, ইতিকাফ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়; বরং এটি বান্দার বিনয়, অসহায়ত্ব ও আল্লাহর রহমতের ওপর পূর্ণ নির্ভরতার জ্বলন্ত প্রকাশ। এ সময় একজন মুমিন যেন আল্লাহর দরবারে নিবেদন করে—‘হে আল্লাহ, আপনার রহমত ছাড়া আমার মুক্তি নেই।’ তাই ইতিকাফকারীদের উচিত এ সময়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে কাজে লাগানো এবং অপ্রয়োজনীয় কথা, অনর্থক ব্যস্ততা ও গাফেলতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা।
ইতিকাফে করণীয় সম্পর্কে আল্লামা মুফতি জসিমুদ্দীন বলেন, শেষ দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর একটি হলো কিয়ামুল্লাইল, অর্থাৎ রাতের নফল নামায। তিনি বলেন, ফরজ নামাযের পর সর্বোত্তম নামায হলো রাতের নামায। কিয়ামুল্লাইল মানুষের অন্তরকে আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত করে, গুনাহ থেকে দূরে রাখে, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং বান্দাকে রবের নৈকট্যের দিকে এগিয়ে দেয়। এ সময় বেশি বেশি তাহাজ্জুদ, নফল নামায ও দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শেষ দশকে কুরআন তিলাওয়াতের গুরুত্ব অপরিসীম। সালাফে সালেহীনের জীবনী তুলে ধরে তিনি বলেন, পূর্বসূরি মনীষীগণ রমযানের শেষ দশকে নিজেদের যাবতীয় ব্যস্ততা সীমিত করে কুরআন তিলাওয়াত, যিকির, দোয়া ও রাতজাগা ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। কেউ প্রতি দুই রাতে, কেউ প্রতি তিন রাতে, আবার কেউ শেষ দশকে প্রতি রাতেই এক খতম কুরআন তিলাওয়াত করতেন। এর মাধ্যমে তিনি মুতাকিফীনদের উদ্দেশে বলেন, অন্তত নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী কুরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে এবং এ সময়টিকে আল্লাহর কালামের সান্নিধ্যে কাটাতে হবে।
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
তিনি বলেন, শুধু নামায ও তিলাওয়াত নয়, বরং বেশি বেশি দোয়া, ইস্তিগফার, তাসবীহ, তাহলীল, দরূদ এবং যিকির-আযকারে নিজেকে ব্যস্ত রাখা প্রয়োজন। বরকতময় সময়গুলোকে যারা মূল্যায়ন করে, আল্লাহ তাআলা তাদের সময়, জীবন ও আমলে বরকত দান করেন। রমযানের শেষ দশকও তেমনই এক মহামূল্যবান সময়, যা অবহেলায় নষ্ট করার সুযোগ নেই।
লাইলাতুল কদর সম্পর্কে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, এ রাতের অর্থই হলো সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ রাত। এটি এমন এক রাত, যার ইবাদতের মূল্য হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। অর্থাৎ প্রায় তিরাশি বছরেরও অধিক সময়ের ইবাদতের সমতুল্য সাওয়াব এ এক রাতেই অর্জিত হতে পারে। এ কারণেই শবে কদর মানুষের জীবনে আল্লাহ তাআলার এক মহা উপহার। পবিত্র কুরআনে এ রাতের ফজিলত বর্ণনা করে পূর্ণ একটি সূরা নাজিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ রাতকে কেন্দ্র করেই নবীজি (সা.) শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামও এ রাতের অনুসন্ধানে মশগুল থাকতেন।
তিনি বলেন, শবে কদরকে শুধু ২৭ রমযানের রাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা ঠিক নয়। যদিও বহু আলেম ও সাহাবির বক্তব্যে ২৭ রাতকে অধিক সম্ভাবনাময় বলা হয়েছে, তবুও সহীহ হাদীসের নির্দেশনা হচ্ছে—রমযানের শেষ দশকে, বিশেষত বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশ করতে হবে। তাই ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ রমযানের প্রতিটি বেজোড় রাত এবং প্রকৃতপক্ষে শেষ দশকের প্রতিটি রাতকেই গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা এ রাতকে অনির্দিষ্ট রেখেছেন, যাতে বান্দার ইবাদতের আগ্রহ, আন্তরিকতা ও ধৈর্যের পরীক্ষা হয়।
মুতাকিফীনদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে এবং সাওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদতে দাঁড়াবে, আল্লাহ তাআলা তার অতীতের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। তাই শেষ দশকের প্রতিটি রাতকে সম্ভাব্য শবে কদর মনে করে ইবাদতে মশগুল থাকতে হবে। নিছক আবেগ বা লোকদেখানো আমল নয়; বরং ইখলাস, একাগ্রতা, খুশু-খুযু ও বিনয়ের সঙ্গে ইবাদতই এ সময়ের আসল দাবি।
শবে কদরের বিশেষ দোয়া প্রসঙ্গে তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত হাদীসের আলোকে বলেন, এ রাতে বেশি বেশি এই দোয়াটি পড়া উচিত— اللّٰهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي অর্থ: ‘হে আল্লাহ, নিশ্চয় আপনি পরম ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন।’
তিনি বলেন, এ দোয়া শুধু শবে কদরের রাতেই নয়, পুরো শেষ দশকজুড়েই বারবার পড়া উচিত।
বয়ানের শেষাংশে আল্লামা মুফতি জসিমুদ্দীন বলেন, রমযানের শেষ দশক আত্মশুদ্ধি, গুনাহমুক্তি, তাকওয়া অর্জন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের সুবর্ণ সময়। যে ব্যক্তি এ সময়টুকুকে সচেতনভাবে ইবাদত, তওবা, কুরআন তিলাওয়াত, নামায, যিকির ও দোয়ার মাধ্যমে কাটাতে পারবে, তার জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অশেষ কল্যাণের দরজা উন্মুক্ত হবে। তিনি সকল মুতাকিফীনকে সুন্নাতসম্মত পদ্ধতিতে ইতিকাফ আদায়, সময়ের যথাযথ হেফাজত এবং দুনিয়াবি ব্যস্ততা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহমুখী হওয়ার আহ্বান জানান।
বয়ানের শেষে আল্লামা মুফতি জসিমুদ্দীন উপস্থিত মুতাকিফীনদের নিয়ে বিশেষ দোয়া করেন। দোয়ায় তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা যেন সবাইকে সহীহ পদ্ধতিতে রমযানের শেষ দশকের আমল করার তাওফিক দান করেন, ইতিকাফ কবুল করেন এবং লাইলাতুল কদরের সৌভাগ্য নসিব করেন।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








