Home ওপেনিয়ন ধর্মবিষয়ক সাংবাদিকদের সমাবেশে যে কথা বলতে চেয়েছিলাম

ধর্মবিষয়ক সাংবাদিকদের সমাবেশে যে কথা বলতে চেয়েছিলাম

মুনির আহমদ। ছবি- উম্মাহ।

।। মুনির আহমদ ।।

গতকাল (২৩ মে) বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমের ধর্মবিষয়ক রিপোর্টারদের সংগঠন রিলিজিয়াস রিপোর্টার্স ফোরাম (আরআরএফ) দৈনিক বাংলা মোড়ের একটি হোটেলে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে শরীক হতে বারিধারা থেকে ঠিক বিকেল ৩:৫০ মিনিটে রওনা হয়ে ভয়াবহ বিরক্তির ট্রাফিক জ্যাম অতিক্রম করে যখন হেফাজত মহাসচিব’সহ অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করি, তখন ইফতারের আর মাত্র ৬ মিনিট বাকী। সংক্ষেপে হেফাজত মহাসচিব বক্তব্য দিয়ে মুনাজাত পরিচালনা করলেন।

ইফতার মাহফিলে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকা এবং অনলাইন ও টিভি মিডিয়ার ধর্মবিষয়ক রিপোটারদের এমন গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশে আমি যে কথাগুলো বলতে চেয়েছিলাম, তা নীচে তুলে ধরলাম। আমার ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা সাংবাদিক বন্ধুরা আশা করি ৫ মিনিট সময় ব্যয় করে পড়বেন। এবং রাজনীতি ও সমাজ সচেতন অন্যরাও পড়ে দেখতে পারেন।

“….গত এক দুই যুগ ধরে বিশ্বব্যাপী মানুষের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক ক্ষেত্রে বড় ধরণের হতাশাজনক পরিবর্তন ঘটে চলেছে। সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও কর্পোরেট ব্যবসার ইন্ধন ও ছত্রছায়ায় বিশ্বের দেশে দেশে স্বৈরতন্ত্র ও জনবিচ্ছিন্ন শাসকরা ঝেঁকে বসেছে। মানুষ দিন দিন সুবিচার, ইনসাফ ও মৌলিক অধিকার হারাচ্ছে। পরাশক্তি ও আঞ্চলিক শক্তিধর দেশসমূহ প্রতিবেশী ও অন্যান্য দুর্বল দেশসমূহের উপর প্রভাবলয় তৈরির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। কিন্তু এ পর্যায়ে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এই পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, কর্পোরেট ব্যবসায়ী ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মরিয়া শক্তিসমূহ ইসলামকেই প্রধান প্রতিপক্ষ ও শত্রু বিবেচনা করছে।

এর প্রধান কারণ হচ্ছে, ইসলাম শুধু মহান প্রভুর ইবাদত-বন্দেগীর মধ্যেই নির্দেশনার পরিধি শেষ করে না। বরং ইসলাম একটা পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধানের ফায়সালা দেয়। সমাজে, রাষ্ট্রে ন্যায়-নীতি, ইনসাফ, সুবিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সম্পদের সুষম বণ্টন এবং যাকাত, দান-সদকা ও কর্জে হাসানার মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে কমিয়ে এনে মানুষে মানুষে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইসলাম মানুষকে অন্ধ ভোগবাদিতা ও আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বের করে পরিবার ও সমাজবদ্ধ জীবন যাপন এবং মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করে। যাতে সাম্য, সুবিচার, ইনসাফের ভিত্তিতে বৃহৎ সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে ওঠে এবং সকল প্রকার অন্যায়, অবিচার এবং যে কোন সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনকে সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করে নিজেদের অধিকার ও স্বকীয়তার পতাকাকে উড্ডীন রাখা যায়।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা, অন্যায়ভাবে প্রভাব বলয় সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক শোষণে মরিয়া পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, কর্পোরেট হাউজ এবং জনবিচ্ছিন্ন শাসক মহল ইসলামের এই দিকটাকেই বড় হুমকি মনে করে। যে কারণে এখন এই জায়গাসমূহেই তাদের দিক থেকে বড় বড় আঘাত আসছে। মুসলিম দেশে দেশে বর্তমানে সবচেয়ে বড় যে হুমকি তৈরি হয়েছে, সেটা হচ্ছে পরিবার ও সমাজ জীবনের উপর। তারা মরিয়া হয়ে চাচ্ছে পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে দিয়ে মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা ও ভোগবাদিতায় ডুবিয়ে দিতে। যাতে মানুষ পুঁজিবাদের প্রোডকশন টুলস ও ভাল ক্রেতা হওয়ার মধ্যেই সীমিত হয়ে পড়ে।

অপরদিকে পরিবার ও সামাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে দিতে পারলে এই অন্যায় অর্থনৈতিক শোষণ, জুলুম ও অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদে মানুষ সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ারও সুযোগ পাবে না। ভোগবাদে নিমগ্ন মানুষ তখন আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাতেই বিভোর থাকবে। অপরদিকে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাস, নারীবিরোধী, সংখ্যালঘুদের অধিকার বিরোধী, সেকেলে চিন্তা, হিজাববিরোধী, দাড়ি-টুপি ও ইসলামী শিক্ষাবিরোধী নানা মিথ্যা প্রচারণা ও মিথ্যা অপবাদ দিয়ে ইসলামকে বিতর্কিত করে কোণঠাঁসা করে ইসলামের ন্যায়-নীতি, সুবিচার, ইনসাফ, সাম্য ও সম্পদের সুষম বণ্টনের আওয়াজ ও আবেদনকে পেছনে ঠেলে দেওয়া। যাতে নির্বিঘ্নে অর্থনৈতিক লুটপাট ও মানুষকে শোষণ করা যায়। এই কাজটাই হচ্ছে।সময় কম হওয়ার কারণে আসলে আমি বিস্তারিত এ বিষয়ে আর বলতে পারছি না। তবে আপনারা বিজ্ঞদের সামনে এর চেয়ে বেশি ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে বলেও মনে করি না। আপনারাও এদিকটা অনুভব করেন ও অবশ্যই অবগত আছেন।

সুপ্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা! সাংবাদিকদেরকে জাতির বিবেক বলা হয়ে থাকে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোর মধ্যে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম অন্যতম। কারণ, জনগণ যা বলতে চায়, যা ভাবে, যা চায় না এবং যেটা প্রত্যাশা করে, যেটা প্রত্যাশা করে না, যেসব জায়গায় অসহায়বোধ করেন, যেসব ইতিবাচক বিষয়ে মানুষের এগিয়ে আসা দরকার, তার সবই আপনাদের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। আপনারা জনগণের সেই আওয়াজকে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে দেন।প্রয়োজনীয় জায়গায় নজরে আনেন।যেহেতু বর্তমানে পুঁজিবাদ ও কর্পোরেট লুটেরাদের সংঘবদ্ধ ষড়যন্ত্রে আমাদের পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাস সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ও হুমকির মুখে, সবচেয়ে বেশি আক্রমণ ও অপপ্রচারের শিকার, এ পর্যায়ে আপনাদের শক্তিশালী ও যথাযথ ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।

আপনাদের প্রতি আমি সবিনয়ে অনুরোধ করবো, আমাদের পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থার উপর যে যে দিক থেকে আঘাত আসছে এবং আমাদের মহান ধর্মের নামে যেসব মিথ্যাচার, অপব্যখ্যা চলছে, নতুন নতুন নানা বিতর্ক তৈরি করে ধর্মীয় বিশ্বাসকে, ধর্মীয় অনুশাসনকে দুর্বল করে দিতে বা ধ্বংস করে দিতে চাচ্ছে, আপনারা এসব অন্যায়, মিথ্যাচার সম্পর্কে ন্যায়সঙ্গত শক্তিশালী ভূমিকা রাখুন। হক্কানী উলামায়ে কেরামের কথাগুলো তুলে ধরুন। সমাজে ন্যায়-নীতি, ইনসাফ, সাম্য, পরোপকারিতা, সম্পদের সুষম বণ্টন, নারীদের ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং সহনশীল সমাজ গড়তে ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশনাগুলো তুলে ধরুন।

মুসলমানদের মধ্যে রহস্যজনক সূত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন নতুন মতাদর্শের উদ্ভব ঘটিয়ে ঐক্য বিনাশ ও নিজেদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে দুর্বল করার যে চক্রান্ত চলানো হচ্ছে, এ পর্যায়েও আপনারা ইসলামের প্রকৃত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও সত্য-মিথ্যাকে সাধারণ মানুষ যাতে চিনে নিয়ে বিবাদে বা কোন বিভ্রান্তিতে না জড়ায়, সেটা নিয়েও আপনাদের বিশাল ভূমিকা রাখার আছে।

আমি শুধু এটাই তুলে ধরতে চাচ্ছি, বর্তমান বিশ্বপ্রেক্ষাপটে আপনারা যারা ধর্মীয় বিট বা ধর্ম ও আদর্শ সংশ্লিষ্ট রিপোর্টিং এর সাথে জড়িত, আপনাদের বিশাল দায়িত্ব এবং দেশ ও জাতির কাছে বিশাল দায়বোধ রয়েছে। আপনারা এই দেশ, এই জাতি এবং প্রকৃত ধর্মীয়মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে সেবা দিয়ে যান। আল্লাহ আপনাদেরকে সে তাওফীক দান করুন। আমীন।”

– মুনির আহমদ, সাবেক নির্বাহী সম্পাদক- মাসিক মুঈনুল ইসলাম, সম্পাদক- উম্মাহ ২৪ ডটকম।

রিলিজিয়াস রিপোর্টার্স ফোরামের ইফতার মাহফিলে আল্লামা বাবুনগরী যা বলেছেন..