Home শিক্ষা ও সাহিত্য নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আল্লামা মুফতি খলীল আহমদ কাসেমীর দিক-নির্দেশনামূলক নসীহত

নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আল্লামা মুফতি খলীল আহমদ কাসেমীর দিক-নির্দেশনামূলক নসীহত

অলংকরণ- উম্মাহ গ্রাফিক্স।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দ্বীনি বিদ্যাপীঠ, আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর ১৪৪৭-৪৮ হিজরি শিক্ষাবর্ষের শুভ সূচনা হয়েছে। আগামীকাল ১১ অক্টোবর (শনিবার) থেকে জামিয়ার মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতকসহ সকল স্তরের নিয়মিত দরস শুরু হতে যাচ্ছে ইনশাআল্লাহ। এই বরকতময় ক্ষণে জামিয়ার মহাপরিচালক, শায়খুল হাদীস হযরত আল্লামা মুফতি খলীল আহমদ কাসেমী কুরাইশী (দা.বা.) শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত নসীহত ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন-

১. ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার ও আত্মিক প্রস্তুতি

“আপনারা আজ এমন এক পবিত্র ভূমি ও ইলমি চত্বরে পদার্পণ করেছেন, যা যুগ যুগ ধরে আসলাফ ও আকাবিরদের রিয়াজত, মোজাহাদা ও চোখের পানিতে সিক্ত হয়েছে। এই ‘উম্মুল মাদারিস’-এর প্রতিটি ধূলিকণায় আমাদের মহান মুরুব্বীদের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। সুতরাং নিজেদের নিয়তকে খালেস করুন এবং এই মহান ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেদের ধন্য মনে করে পূর্ণ একাগ্রতার সাথে ইলম অর্জনে আত্মনিয়োগ করুন।”

২. কঠোর অধ্যবসায় ও সময়ের আমানত

“আপনারা দ্বীনের বৃহৎ পরিসরে খেদমত করার মহান সংকল্প নিয়ে মাদ্রাসার এই জিন্দেগিকে বেছে নিয়েছেন। এই ত্যাগের সার্থকতা তখনই আসবে যখন আপনারা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলবেন। দরসে নিয়মিত উপস্থিতি এবং গভীর রাত পর্যন্ত কিতাব মুতালায়া (গবেষণা) ও তাকরার করা একজন তালিবে ইলমের প্রধান অলঙ্কার। সময়ের প্রতিটি মুহূর্তকে মহান আল্লাহর আমানত মনে করে তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করুন।”

৩. আদব ও জামিয়ার শৃঙ্খলা রক্ষা

“আল-আদাবু ফাউকাল ইলম, অর্থাৎ আদব ইলমের চেয়েও ঊর্ধ্বে। জামিয়ার সকল উস্তাদ, কর্মকর্তা ও দায়িত্বশীলদের প্রতি সর্বোচ্চ বিনয় ও শ্রদ্ধা বজায় রাখতে হবে। সাথীদের সাথে সদাচরণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং জামিয়ার অভ্যন্তরীণ প্রতিটি আইন ও শৃঙ্খলা কঠোরভাবে মেনে চলা অপরিহার্য। বিনা প্রয়োজনে বাইরে ঘোরাফেরা বা বাজারে আড্ডা দেওয়া একজন তালিবে ইলমের আখলাক, গাম্ভীর্য ও ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী।”

৪. প্রযুক্তি ও স্মার্টফোনের ভয়াবহতা

“শিক্ষা জীবনে স্মার্টফোন তালিবে ইলমদের মেধা ও আখলাকের জন্য মারাত্মক বিষের মতো। জামিয়া ক্যাম্পাসে স্মার্টফোন রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে মানবিক ও জরুরি প্রয়োজনে অভিভাবকের সাথে যোগাযোগের জন্য আছর থেকে মাগরিব পর্যন্ত কেবল ‘বাটন ফোন’ ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। এই নিয়মের ব্যতয় ঘটলে জামিয়া কর্তৃপক্ষ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য হবে। মনে রাখবেন, আপনাদের কল্যাণ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বার্থেই এই কঠোরতা।”

আরও পড়তে পারেন-

৫. ডিজিটাল ফিতনা ও সাইবার সচেতনতা

“বর্তমান সময়ের অন্যতম ফেতনা হলো সোশ্যাল মিডিয়া। তালেবে ইলমদের জন্য ফেসবুক-ইউটিউবের অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক, কাদা-ছোড়াছুড়ি এবং রাজনৈতিক তর্কে জড়ানো অত্যন্ত ক্ষতিকর। আপনাদের প্রধান কাজ এখন শৃঙ্খলা ও মনোযোগধরে রেখে ইলম ও আমলের ময়দানে নিজেদের প্রস্তুত করা। ডিজিটাল জগতের বিভ্রান্তি থেকে নিজেদের অন্তরকে হেফাজত করাও এই সময়ের অন্যতম বড় জিহাদ।”

৬. আমলি জিন্দেগি ও সুন্নাতের পাবন্দী

“কেবল কিতাবী ইলমই যথেষ্ট নয়। আপনাদের অবশ্যই জামাতে তাকবীরে উলার সাথে নামাজ আদায় করতে হবে। প্রতিদিন ভোরে ও সন্ধ্যায় কুরআন তিলাওয়াত এবং সুন্নাতভিত্তিক জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলুন। রাত ১০টার মধ্যে বিশ্রাম নিয়ে শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ ও কিতাব মুতালায়ার বরকতময় সময়টিকে কাজে লাগান। আমলহীন ইলম কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না।”

৭. পরিচ্ছন্নতা ও সুস্থতার যত্ন

“ইলম অর্জনের জন্য সুস্থতা অপরিহার্য। আপনারা আপনাদের কামরা, আঙিনা এবং নিজেদের পোশাক-পরিচ্ছদ পরিচ্ছন্ন রাখবেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ এবং এটি একাগ্রতা বাড়াতে সাহায্য করে। জামিয়া অঙ্গনের সুন্দর পরিবেশ সুরক্ষায় প্রতিটি ছাত্রকে সর্বোচ্চ সচেতন থাকতে হবে।”

৮. বাতিল ফেরকা ও সমকালীন ষড়যন্ত্র মোকাবেলা

“ইসলামকে কলঙ্কিত করতে এবং মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে নানামুখী বাতিল ফেরকার প্রতিনিয়ত উত্থান ঘটছে। এসব ফিতনা ও অপতৎপরতা রুখতে হলে আপনাদের ইলমে ফিকহ, আকাইদ ও ইসলামের মৌলিক জ্ঞানসহ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমকালীন বিষয়েও গভীর পারদর্শিতা অর্জন করতে হবে। যোগ্য আলেম ও দক্ষ রাহবার হওয়া সময়ের দাবি।”

৯. উস্তাদদের দোয়া ও কিতাবের মর্যাদা

“মনে রাখবেন, কেবল মেধা দিয়ে ইলম অর্জন হয় না, বরং উস্তাদদের নেক দুআ ও তাঁদের সন্তুষ্টিই হলো ইলমের আসল বরকত। দরসে ও দরসের বাইরে তাঁদের খেদমতের সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। পাশাপাশি মাদ্রাসার কুতুবখানা আমাদের আকাবিরদের আমানত; কিতাবকে প্রাণের চেয়েও প্রিয় জ্ঞান করবেন এবং এর সর্বোচ্চ আদব রক্ষা করবেন।”

পরিশেষে জামিয়া মহাপরিচালক হযরত আল্লামা মুফতি খলীল আহমদ কাসেমী (দা.বা.) দোয়া করে বলেন, “আজ ইসলাম ও উম্মাহর এই সংকটকালে কওম আপনাদের নেতৃত্বের অপেক্ষায় আছে। আপনারা যদি ইলম ও আমলে কামালাত (পূর্ণতা) অর্জন করতে পারেন, তবেই আপনারা উম্মাহর পথপ্রদর্শক হতে পারবেন।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আপনাদের ইলম ও আমলে বরকত দান করুন, আপনাদেরকে সহীহ-সালামতে এবং দ্বীনের খাদেম হিসেবে কবুল করুন। আমীন।

অনুলিখনে: মাওলানা মুনির আহমদ
শিক্ষক- উচ্চতর বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী।
নির্বাহী সম্পাদক- মাসিক মুঈনুল ইসলাম।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।