Home কবিতা ‘আল্লামা ইকবাল’

‘আল্লামা ইকবাল’

3

।। মালেকা ফেরদৌস ।।

কয়েক শতাব্দী পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর উদ্যানে
তোমার মত গানের পাখিরা আসে দু’একটি।

তোমার হৃদয়ের গুঞ্জরিত আহ্বান-
মোমিনের শোনিতে খেলা করে ঈমানের ঢেউ,
তোমার গজলের সুমিষ্ট ঘ্রাণ আমাকে বিহব্বল করে
দেশ, কাল, পাত্রের সব ব্যবধান ঘুচে যায়,
হৃদয়ের নিভৃতে যেখানে প্রভুর আসন-
বিস্ময়ে দেখি তুমি নত হয়ে আছ,
প্রেমের আবিরে সিক্ত তোমার দু’চোখ।

পুষ্পময় তোমার হৃদয়, আসমান অবধি বিশ্বাস-
তবে কি তোমার সব কিছুই সৌন্দর্যের
জারকে ভিজিয়ে সৃষ্টি করেছেন প্রভু!

তোমার প্রতিটি শব্দের ভেতর অনুপম শব্দের খেলা
কথার ভেতরে প্রেম আর ঈমানের উন্মিলিত ধ্বনির প্রোটন।
তোমার কবিতা সেতো মুমিনের আত্মার খোরাক-
মানবিক আওয়াজের এক অনুপম আণবিক ফুলের সুবাস।

অন্ধকার উপমহাদেশে তুমি ছিলে আমাদের আশার গর্জন,
লক্ষ কোটি মানুষের তরঙ্গের ভেতর বুনেছিলে স্বপ্নের বীজ,
তোমার এই বিশাল স্বপ্নকে কোথায় ধরে রাখবো আমরা
আমরাতো অনেক আগেই সংকীর্ণ নদী হয়ে গেছি,
সুদূর বাংলা থেকে তোমার জন্য এক সাধারণ কবির সালাম।

[২১ এপ্রিল আল্লামা ইকবালের মৃত্যু দিবসে মহান কবির প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশে রচিত। ]

আল্লামা ইকবালের সংক্ষিপ্ত জীবনী:

বিশ্বখ্যাত কবি স্যার আল্লামা ইকবাল (রাহ.) ১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতেরপাঞ্জাব প্রদেশের (বর্তমানে পাকিস্তান) শিয়ালকোটের একটি জাতিগত কাশ্মীরি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল লাহোরে তিনি ইন্তিকাল করেন।

আল্লামা ইকবাল অবিভক্ত ভারতবর্ষের মুসলিম কবি, দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ, শিক্ষবিদ ও ব্যারিস্টার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর রচিত কবিতা আধুনিক যুগের ফার্সি ও উর্দু সাহিত্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ পাঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁকে অবিভক্ত স্বাধীন পাকিস্তানের আধ্যাত্মিক জনক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ইকবাল তাঁর ধর্মীয় ও ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের জন্যও বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন।

ইকবাল তার কাব্য প্রতিভার স্বীকৃতি পান তার শিক্ষক সাইয়িদ মীর হাসানের কাছ থেকে। ১৮৮৫ সালে স্কটিশ মিশন কলেজের পড়াশোনা শেষ করে ইকবাল লাহোরের সরকারি কলেজে ভর্তি হন। দর্শন, ইংরেজি ও আরবি সাহিত্য নিয়ে তিনি পড়াশোনা করেন। এখান থেকে তিনি স্বর্ণ পদক নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৯২ সালে ইকবাল স্কটিশ মিশন কলেজ হতে পড়াশোন শেষ করেন। তিনি ১৮৯৫ সালে চারুকলা অনুষদের থেকে ইন্টারমিডিয়েট লাভ করেন। ১৮৯৯ সালে যখন তিনি মাষ্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন ততদিনে তিনি সাহিত্য অঙ্গনে পরিচিত ব্যক্তিত্ব।

মাস্টার্স ডিগ্রিতে পড়াশোনার সময় ইকবাল স্যার টমাস আর্নল্ড এর সংস্পর্শে আসেন। এই শিক্ষাবিদ ইসলাম ও আধুনিক দর্শনে বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। ইকবালের কাছে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছিলেন। স্যার টমাস আর্নল্ডই ইকবালকে ইউরোপে উচ্চ শিক্ষায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন। সেই সূত্রেই আইন বিষয়ে পড়াশোনার জন্য ইউরোপ গমন করেন।

আল্লামা ইকবাল ১৯০৫ সাল হতে লন্ডনে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লিঙ্কনস্ ইন হতে আইনের ডিগ্রি লাভ করেন। আর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন জার্মানির মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় হতে। ফ্রিডরিচ হোমেলের পরিচালনায় কাজ করা ইকবালের ডক্টরাল থিসিসটি ছিল- The Development of Metaphysics in Persia.

আল্লামা ইকবাল ভারতীয়, পাকিস্তানী, বাংলাদেশী, ইরানিয়ান এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি হিসাবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও প্রশংসিত। যদিও ইকবাল প্রখ্যাত কবি হিসাবে সর্বাধিক পরিচিত, তিনি ‘আধুনিক সময়ের মুসলিম দার্শনিক তথা চিন্তাবিদ’ হিসাবেও অত্যন্ত প্রশংসিত। ফার্সি ভাষায় রচিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আসরার-ই-খুদী’ ১৯১৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে- ‘রুমুজ-ই-খুদি’, ‘পয়গাম-ই-মাশরিক’ এবং ‘জুবুর-ই-আজম’ অন্যতম। তাঁর বিখ্যাত সাহিত্য সংকলনের মধ্যে- ‘বাং-ই-দারা’, ‘বাল-ই-জিবরাইল’ এবং ‘আরমাঘান-ই-হিজাজ’ অন্যতম। এছাড়াও আল্লামা ইকবালের ‘শিকওয়া ও জবাবে শিকওয়া’, ‘দ্যা রিকনস্ট্রাকশন ওফ রিলিজিয়াস থট ইন ইসলাম’, ‘জাভেদ নামা’, ইত্যাদি গ্রন্থ অত্যন্ত গভীর দার্শনিক ভাব সমৃদ্ধ রচনা হিসেবে উপমহাদেশে প্রসিদ্ধ।

১৯২২ সালের নিউ ইয়ার্স অনার্সে রাজা পঞ্চম জর্জ কর্তৃক আল্লামা ইকবাল ‘নাইট ব্যাচেলর’ এ ভূষিত হয়েছিলেন। দক্ষিণ এশিয়া ও উর্দু-ভাষী বিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চলে ইকবালকে ‘শায়েরে মাশরিক’ তথা প্রাচ্যের কবি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তাঁকে মুফাক্কির-ই-পাকিস্তান‎‎ তথা ‘পাকিস্তানের চিন্তাবিদ’, মুসোয়াওয়ার-ই-পাকিস্তান তথা ‘পাকিস্তানের শিল্পী’ এবং হাকিম-উল-উম্মাত‎‎, ‘উম্মাহর ভরসা’ ইত্যাদি নামে ডাকা হয়।

তাঁর একটি বিখ্যাত চিন্তা দর্শন হচ্ছে- ভারতের মুসলমানদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন। এই চিন্তাই পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর নাম মুহাম্মদ ইকবাল হলেও তিনি আল্লামা ইকবাল হিসেবেই অধিক পরিচিত। ‘আল্লামা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে শিক্ষাবিদ । ফার্সিতে সৃজনশীলতার জন্য ইরানেও তিনি ছিলেন সমধিক প্রসিদ্ধ। তিনি ইরানে ইকবাল-ই-লাহোরী নামে পরিচিত।

পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে ‘পাকিস্তানের জাতীয় কবি’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাঁর জন্মদিন ‘ইয়াম-ই ওয়েলাদাত-ই মুআম্মাদ ইকবাল‎‎’ বা ইকবাল দিবস হিসেবে পাকিস্তানে পালিত হয়। এই দিন পাকিস্তানে সরকারী ছুটি থাকে।

ইকবালের বাড়ি এখনও শিয়ালকোটে অবস্থিত এবং এটি ইকবালের মঞ্জিল হিসাবে স্বীকৃত এবং দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। তাঁর অন্য আরেক বাড়ি যেখানে তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন এবং ইন্তিকাল করেছেন, সেটা লাহোর রেল স্টেশনের কাছে আল্লামা ইকবাল রোডে অবস্থিত। এই বাড়িটি জাভেদ মনজিল’ নামে পরিচিত। পরে এই বাড়িকে ইকবাল জাদুঘর করা হয়।

– মালেকা ফেরদৌস, কবি, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ।

লেখকের আরো কবিতা পড়তে পারেন-

‘ক্লান্তি দিওনা রহমান!’

আমার বাবা

করোনার মৌলবাদ

ক্ষমা করুন প্রভু!