।। জাওয়াতা আফনান ।।
মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন প্রতিবাদ করার মতো ভাষা থাকে, জবাব দেওয়ার মতো যুক্তি থাকে, এমনকি প্রতিপক্ষকে নীরব করে দেওয়ার মতো সামর্থ্যও থাকে—তবু একজন মুমিন চুপ থাকেন। এই চুপ থাকা ভীরুতা নয়, পরাজয় নয়, আত্মসমর্পণও নয়; বরং এটি আত্মার গভীরে নিহিত এক উচ্চতর শক্তির পরিচয়। ইসলামের ভাষায় এই শক্তির নাম—সবর।
সবর মানে শুধু কষ্ট সহ্য করা নয়; সবর মানে হলো নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, আবেগের দাবানলকে সংযমের শীতলতায় নেভানো, প্রতিশোধের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে সংবরণ করা। তাই সবর নিছক নীরবতা নয়; এটি ঈমানের পরিপক্বতা, আত্মিক দৃঢ়তা এবং রবের প্রতি গভীর আস্থার বহিঃপ্রকাশ।
মানুষের কিছু কথা কানে এসে থেমে যায় না; সেগুলো হৃদয়ের দেয়ালে আঁচড় কেটে বসে। কেউ একটি বাক্য বলে চলে যায়, কিন্তু তার অভিঘাত দীর্ঘ সময় ধরে বয়ে বেড়ায় অন্য একজন। কখনো অপমান, কখনো ভুল বোঝাবুঝি, কখনো অবমূল্যায়ন—এসবই মানুষের অন্তরকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। এমন সময়েই কুরআনের নির্দেশ মুমিনের অন্তরে আলো জ্বালে— وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا يَقُولُونَ “তারা যা বলে, আপনি তার ওপর ধৈর্য ধারণ করুন।” (সূরা আল-মুযযাম্মিল, ৭৩:১০)।
এই আয়াতের আবেদন গভীর। এখানে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ এমন অবস্থায় দেওয়া হয়েছে, যখন মানুষ কথার আঘাতে বিদ্ধ হয়। অর্থাৎ, ইসলাম মানুষের কষ্টকে অস্বীকার করে না; বরং কষ্টের মুখে তার প্রতিক্রিয়াকে মহিমান্বিত করে। যে ব্যক্তি কটু কথার জবাবে কটু কথা না বলে, অপমানের বিপরীতে নিজেকে সংযত রাখে, সে বাহ্যিকভাবে নীরব হলেও ভেতরে ভেতরে একটি বড় যুদ্ধ জিতে যায়।
প্রকৃতপক্ষে, সবর দুর্বলদের গুণ নয়; এটি শক্তিমানদের অলংকার। কারণ যে প্রতিউত্তর দিতে পারে না, তার নীরবতা সবর নয়; কিন্তু যে প্রতিউত্তর দিতে সক্ষম, তবু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখে—তার নীরবতাই সবর। এ এক এমন বিজয়, যা বাহিরে প্রকাশ পায় না, কিন্তু আসমানে যার মূল্য অপরিসীম।
এ কারণেই কুরআন শুধু ধৈর্যের কথাই বলেনি; ক্ষমা ও উপেক্ষার দিকেও মুমিনকে আহ্বান করেছে— فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاصْفَحْ “তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং উপেক্ষা করুন।” (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:১৩)।
ক্ষমা করা অনেক সময় কঠিন; কিন্তু উপেক্ষা করা আরও কঠিন। কারণ ক্ষমা মুখে উচ্চারণ করা যায়, অথচ উপেক্ষা করতে হলে অন্তরের ক্ষতকেও আল্লাহর কাছে সঁপে দিতে হয়। সবর সেই সঁপে দেওয়ার নাম। মানুষ যখন নিজের ব্যথাকে আল্লাহর দরবারে জমা রাখে, তখন সে আর প্রতিটি আঘাতের প্রতিক্রিয়া পৃথিবী থেকে আদায় করতে চায় না। সে জানে, সব হিসাব মানুষের হাতে নেই; চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর কাছেই।
জীবনের বহু বেদনা এমন, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কিছু কষ্ট আছে, যা মানুষের সামনে বলা যায় না; কিছু অশ্রু আছে, যা জনসম্মুখে ঝরে না; কিছু অভিমান আছে, যা কণ্ঠে আটকে থাকে। তখন মনে হয়—আমি কি একাই এই বোঝা বহন করছি? আমার নীরবতা কি কেউ শুনছে? আমার ভাঙা অন্তর কি কেউ দেখছে?
এই প্রশ্নের উত্তরে কুরআন মুমিনকে যে সান্ত্বনা দেয়, তা অতুলনীয়— إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ “নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩)।
এটি শুধু একটি সান্ত্বনাবাক্য নয়; এটি এক মহৎ আধ্যাত্মিক ঘোষণা। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের “দেখেন”—এ কথা বলা হয়নি শুধু; বলা হয়েছে, তিনি তাদের “সঙ্গে” আছেন। অর্থাৎ, সবরকারীর নিঃসঙ্গতা প্রকৃত নিঃসঙ্গতা নয়। তার চারপাশের মানুষ তাকে না বুঝলেও, তার দীর্ঘশ্বাস কেউ না শুনলেও, তার ক্ষত কেউ না দেখলেও—তার রব তাকে দেখছেন, শুনছেন এবং জানছেন।
এই অনুভূতি মুমিনের অন্তরকে এমন শক্তি দেয়, যা বাহ্যিক কোনো সমর্থন দিতে পারে না। মানুষ সরে যেতে পারে, আপনজন ভুল বুঝতে পারে, নিকটতম কেউও পাশে না-ও থাকতে পারে; তবু একজন মুমিন ভেঙে পড়ে না, কারণ সে জানে—তার রব তাকে ছেড়ে যাননি।
এই অর্থই আরও গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে সূরা আত-তাওবার সেই ঐতিহাসিক আয়াতে, যেখানে গুহার অন্ধকারে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর সঙ্গীকে বলেছিলেন— لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا “চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা আত-তাওবা, ৯:৪০)।
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
এ আয়াত শুধু একটি বিশেষ ঘটনার বর্ণনা নয়; বরং সব যুগের মুমিনের জন্য এক চিরন্তন সান্ত্বনা। যখন চারদিক অন্ধকার, যখন সামনের পথ বন্ধ, যখন ভয় ও অনিশ্চয়তা একসঙ্গে হৃদয়কে চেপে ধরে—তখনও আল্লাহর সান্নিধ্যই সবচেয়ে বড় আশ্রয়। মানুষ যদি পুরো পৃথিবী হারিয়েও ফেলে, কিন্তু আল্লাহকে না হারায়, তবে সে আসলে নিঃস্ব নয়।
আজকের পৃথিবীতে সবরের প্রয়োজন আরও বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে প্রতিটি কথা সঙ্গে সঙ্গে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা, প্রতিটি আঘাতের প্রকাশ্য জবাব, প্রতিটি অপমানের তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ—এসব যেন স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়েছে। মানুষ মনে করে, চুপ থাকা মানে হেরে যাওয়া। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে সবসময় তা সত্য নয়। অনেক সময় চুপ থাকা পরাজয় নয়; বরং তা নৈতিক উচ্চতা। অনেক সময় উত্তর না দেওয়া অক্ষমতা নয়; বরং তা আত্মসম্মান, প্রজ্ঞা এবং তাকওয়ার সম্মিলিত প্রকাশ।
তবে সবরের অর্থ জুলুমকে বৈধতা দেওয়া নয়, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা নয়, বা সত্যকে গোপন করে রাখা নয়। সবর মানে হলো—সত্যের পথে থেকে, ন্যায়ের অবস্থানে অটল থেকে, নিজের প্রতিক্রিয়াকে আল্লাহভীরুতার আলোকে নিয়ন্ত্রণ করা। যেখানে কথা বলা জরুরি, সেখানে কথা বলতে হবে; কিন্তু যেখানে নফস কথা বলতে চায়, আর ঈমান চুপ থাকতে বলে—সেখানে চুপ থাকাই ইবাদত।
সবরের আরেকটি দিক হলো—এটি অন্তরের পরিশুদ্ধি ঘটায়। মানুষ যখন দুঃখে, অপমানে বা বঞ্চনায় আল্লাহর দিকে ফিরে যায়, তখন তার হৃদয় আগের চেয়ে বেশি নম্র হয়, বেশি পরিণত হয়, বেশি আলোকিত হয়। সে শিখে যায়—সব প্রশ্নের উত্তর মানুষের কাছে নেই, সব হিসাব দুনিয়াতেই মেটে না, সব অশ্রুর ব্যাখ্যাও ভাষায় দেওয়া যায় না। কিছু বিষয় আছে, যা শুধু সেজদায় বলা যায়; কিছু ব্যথা আছে, যা কেবল আল্লাহই বোঝেন।
এই কারণেই সবর শুধু একটি নৈতিক গুণ নয়; এটি এক ধরনের ইবাদত। এমন ইবাদত, যা শব্দহীন; তবু যার প্রতিদান অপরিমেয়। এতে বাহ্যিক প্রদর্শন নেই, করতালি নেই, প্রশংসা নেই; কিন্তু আছে আল্লাহর নৈকট্য, অন্তরের প্রশান্তি এবং আখিরাতের অফুরন্ত প্রতিদান।
যে ব্যক্তি আজ নীরবে সহ্য করছে, যে চোখের পানি লুকিয়ে রেখেও রবের প্রতি অসন্তুষ্ট হচ্ছে না, যে অপমানের জবাব না দিয়ে নিজেকে আল্লাহর কাছে সঁপে দিচ্ছে—সে জেনে রাখুক, তার নীরবতা বৃথা যাচ্ছে না। আল্লাহ তার নীরব কান্নাও জানেন, তার বুকের চাপাও জানেন, তার ক্ষতও জানেন। পৃথিবী তাকে দুর্বল ভাবলেও, আল্লাহর কাছে সে দুর্বল নয়; বরং সে-ই শক্তিমান, যে নিজের ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং নিজের কষ্টকে ঈমানের আলোয় বহন করতে পারে।
সবর তাই নিছক ধৈর্যের নাম নয়; এটি শক্তির এক নীরব উচ্চারণ। এমন এক শক্তি, যা মানুষের সামনে নয়, প্রথমত আল্লাহর কাছে নিজের দাসত্বকে সত্য প্রমাণ করে। আর যে বান্দা এই সবরকে আঁকড়ে ধরে, সে অন্ধকারের মাঝেও ভেঙে পড়ে না; কারণ সে জানে—তার রব তার সঙ্গে আছেন।
সবরের নীরবতার ভেতরেই কখনো কখনো সবচেয়ে উচ্চকিত ঈমানের ঘোষণা ধ্বনিত হয়।
—জাওয়াতা আফনান, ফটিকা, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








