Home ইসলাম যে সকল কারণে হাজিদের দম বা সাদক্বা দিতে হয়

যে সকল কারণে হাজিদের দম বা সাদক্বা দিতে হয়

1

।। মুফতি ইবরাহীম আনোয়ারী ।।

হজ্জ বা উমরার মধ্যে কিছু এমন ভুল-ত্রুটিও হয়, যার কারণে দম দেয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। আবার এমন কিছু ভুল-ত্রæটিও হয় যার কারণে দম ওয়াজিব হয়না তবে সদকা ওয়াজিব হয়। “দম” বলতে সাধারণভাবে একটা বকরী বা ভেড়া বা দুম্বা বুঝায়, কিম্বা গরু বা মহিষ বা উটের এক সপ্তমাংশ বোঝায়। আর “সদকা” বলতে সাধারণভাবে এক ফিতরা পরিমাণ দান করাকে বোঝায়। এই দম-এর প্রাণী হারামের সীমানার মধ্যে জবাই হওয়া জরুরী এবং কুরবানীর যোগ্য হওয়া জরুরী।

এহরাম অবস্থায় মাথা, চেহারা, দাড়ি, হাত হাতের তালু, পায়ের গোছা, রান ইত্যাদি বড় অঙ্গের পূর্ণ স্থানে খুশবু লাগালে দম ওয়াজিব হয়। নাক, কান, গোঁপ, আঙ্গুল প্রভৃতি ছোট অঙ্গেও বেশী পরিমাণ খুশবু লাগালে দম ওয়াজিব হয়। তবে ছোট অঙ্গে অল্প পরিমাণ খুশবু লাগালে দম নয় বরং সদকা ওয়াজিব হয়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে খুশবু লাগালে দেখতে হবে যদি তা একত্রিত করলে বড় অঙ্গের সমপরিমাণ হয়ে যেত বলে নে হয়, তাহলেও দম দিতে হবে।

যদি কাপড়ে খুশবু লাগায় বা খুশবু লাগানো কাপড় পরিধান করে, তাহলে খুশবুর পরিমাণ এক বর্গবিঘত বা তার বেশী হলে এবং পূর্ণ এক রাত বা পূর্ণ একদিন পরিধান করলে দম ওয়াজিব হবে। আর খুশবুর পরিমাণ তার চেয়ে কম হলে বা পূর্ণ একরাত কিম্বা পূর্ণ একদিনের চেয়ে কম সময় পরিধান রলে সদকা ওয়াজিব হবে। জাফরান বা কুসুম রঙের কাপড় পূর্ণ একদিন বা পূর্ণ একরাত পরিধান করলে দম ওয়াজিব হবে। আর তার চেয়ে কম সময় পরিধান করলে সদকা ওয়াজিব হবে।

এহরাম অবস্থায় মহিলাগণ হাতে মেহেদি লাগালে দম ওয়াজিব হয়। পুরুষগণ পূর্ণ হাতের তালু বা সমস্ত দাড়িতে মেহেদি লাগালে দম ওয়াজিব হবে। পুরুষগণ শরীরের পরিমাপে বানানো হয়েছে এমন সেলাইযুক্ত পোষাক এহরামের সময় স্বাভাবিক নিয়মে পূর্ণ একদিন বা পূর্ণ একরাত পরিমাণ সময় বা তার চেয়ে বেী সময় পরিধান করলে দম ওয়াজিব হবে। তার চেয়ে কম সময় (সর্বনিম্ন এক ঘন্টা) পরিধান করলে সদকা ওয়াজিব হবে। আর এক ঘন্টার চেয়ে কম সময় পরিধান করলে সামান্য কিছু পয়সা দান করলে) চলবে।

পুরুষগণ এহরাম অবস্থায় পায়ের মধ্যবর্তী উঁচু হাড় ঢাকা পড়ে- এমন জুতা, বুট বা মোজা পূর্ণ একদিন বা পূর্ণ একরাত পরিমাণ সময় পরিধান করে থাকলে দম ওয়াজিব হবে। তার চেয়ে কম সময় হরে সদকা ওয়াজিব হবে। এহরাম অবস্থায় পুরুষগণ পূর্ণ একদিন বা পূর্ণ একরাত কিম্বা তার চেয়ে বেশী পরিমাণ সময় পুরো মাথা বা পুরো চেহারা কিম্বা অন্ততঃ চার ভাগের একভাগ কোন কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখরে দম ওয়াজিব হবে। আর তার চেয়ে কম সময় হলে সদকা ওয়াজিব হবে।

এহরাম অবস্থায় মাথা বা দাঁড়ির চুলের এক চতুর্থাংশ কিম্বা তার চেয়ে বেশী পরিমাণ মুন্ডালে বা কাটলে বা উপড়ালে বা কোন কিছু দ্বারা দূর করলে দম ওয়াজিব হবে। আর তার চেয়ে কম পরিমাণ হলে সদকা ওয়াজিব হবে। পূর্ণ ঘাড় বা পূর্ণ একটা বগল বা নাভির নীচের পশম দূর করলে দম ওয়াজিব হবে। আর তার চেয়ে কম পরিমাণ হলে সদকা ওয়াজিব হবে। উযূ করতে যেয়ে বা কোন ভাবে মাথা কিম্বা দাঁড়ির তিনটি চুল পড়ে গেলে এক মুষ্টি গম (পরিমাণ) সদকা করবে আর ইচ্ছাকৃত উপড়ালে প্রত্যেক চুলের বিনিময়ে এক মুষ্টি পরিমাণ দিতে হবে। আর তিনের অধিক চুল উপড়ালে পূর্ণ সদকা দিতে হবে। রান্না করতে গিয়ে কিছু চুল ঝরে গেলে সদকা করবে। রোগের কারণে চুল পড়ে গেলে বা ঘুমন্ত অবস্থায় ঝরে গেলে কিছু ওয়াজিব হয় না।

কোন মুহরিম (এহরাম রত ব্যক্তি) অন্য কোন মুহরিম বা হালাল ব্যক্তির গোঁপ মুন্ডান করে বা কেটে দিলে কিম্বা নখ কেটে দিলেও কিছু পরিমাণ (যা ইচ্ছা হয়) সদকা করে দিবে। এহরাম অবস্থায় নখ কাটলে দম ওয়াজিব হয়। ভাঙ্গা নখ কাটলে কিছু দেয়া ওয়াজিব হয় না। স্বপ্নদোষ হলে কিছু ওয়াজিব হয় না তবে গোসল ওয়াজিব হয়। উকূফে আরাফা-র পর মাথা হলক (বা কছর) ও তাওয়াফে যিয়ারত করার পূর্বে সঙ্গম করলে হজ্জ ফাসেদ হবে না তবে পূর্ণ একটা গরু বা উট দম দিতে হবে। মাথা হলক বা কছর করার পর এবং তাওয়াফে যিয়ারতের পূর্বে সঙ্গম হলেও মুহাক্কিক ওলামায়ে কিরামের মতে অনুরূপ পূর্ণ একটা গরু বা উট দম দিতে হবে।

জানাবাত বা হায়েয নেফাস অবস্থায় তাওয়াফে যিয়ারত করলে পূর্ণ গরু বা উট দম দিতে হবে। কেরান হজ্জকারী ব্যক্তি উমরা-র তাওয়াফ এবং উকূফে আরাফা-র পূর্বে সঙ্গম করলে হজ্জ উমরা উভয়টা ফাসেদ হয়ে যাবে এবং দুটো দম ওয়াজিব হবে। আর আগামীতে হজ্জ উমরা উভয় কাযা করতে হবে। উমরা করনেওয়ালা তাওয়াফের পর সায়ীর পূর্বে কিম্বা তাওয়াফ ও সায়ীর পর মাথা হলক বা কছর করার পূর্বে সঙ্গম করলে উমরা ফাসেদ হয় না তবে দম দিতে হয়। এহরাম অবস্থায় একটা উকুন মারলে একটা খেজুর দান করবে এবং দুটো বা তিনটা উকুন মারলে এক মুষ্টি গম (এর পরিমাণ) দান করবে। আর তিনের অধিক উকুন মারলে পূর্ণ একটা সদকা দিতে হবে। উকুন মারার জন্য কাপড় রৌদ্রে দিলে বা উকুন মারার উদ্দেশ্যে কাপড় ধৌত করলে এবং উকুন মারা গেলেও একই মাসআলা।

৯ই জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পূর্বে আরাফা ময়দানের সীমানা ত্যাগ করলে দম দিতে হবে। সুবহে সাদিক হওয়ার পূর্বে মুযদালিফা ময়দান ত্যাগ করলে দম দিতে হবে। যদি কেউ কয় দিনের রমী (কংকর নিক্ষেপ) পরিত্যাগ করে অথবা এক দিনের রমী পূর্ণ পরিত্যাগ করে কিম্বা এক দিনের রমী-র অধিকাংশ পরিত্যাগ করে (যেমন দশ তারিখে ৪টা কংকর কম নিক্ষেপ করল কিম্বা অন্য যে কোন দিন ১১টা কংকর কম নিক্ষেপ করল) তাহলে এ সকল অবস্থায় দম ওয়াজিব হবে। আর যদি এক দিনের রমী থেকে অল্প সংখ্যক কংকর কম থেকে যায় তাহলে প্রত্যেক ছুটে যাওয়া কংকরের বদলায় একটা পূর্ণ সদকা ওয়াজিব হবে। হতে সব সদকা একত্রে একটা দম-এর সমমূল্যের হয়ে গেলে কিছুটা কম করে দিবে।

কেরান ও তামাত্তু হজ্জকারীদের জন্য দমে শোকর বা হজ্জের কুরবানী করা ওয়াজিব। না করলে দম দিতে হবে। কেরান ও তামাত্তু হজ্জকারীদের জন্য ১০ই জিলহ্জ্জ প্রথমে বড় জামরায় কংকর নিক্ষেপ, তারপর কুরবানী ও তারপর মাথা মুন্ডানো- এই তারতীব রক্ষা করা ওয়াজিব এবং ইফরাদ হজ্জকারী-র জন্য প্রথমে কংকর নিক্ষেপ তারপর মাথা মুন্ডানো- এই তারতীব রক্ষা করা ওয়াজিব। এই তারতীবের মধ্যে ওলট পালট হলে দম ওয়াজিব হবে। ১১ ও ১২ই জিলহজ্জ সূর্য ঢলার পূর্বেই কংকর নিক্ষেপ করলে পুনরায় সূর্য ঢলার পর কংকর নিক্ষেপ করতে হবে। না করলে দম দিতে হবে।

মীনার সীমানাতেই ১৩ই জিলহজ্জের সুবহে সাদিক হয়ে গেলে ১৩ তারিখও তিন জামরায় কংকর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব হয়ে যায়। না করলে দম দিতে হবে। বিদায়ী তাওয়াফ করা ওয়াজিব। না করলে দম দিতে হবে।এহরাম অবস্থায় হারামের সীমানার ভিতরে বা বাইরে যে কোন স্থানে স্থলভাগে জন্মগ্রহণকারী প্রাণী শিকার করা হারাম । শিকার করলে উক্ত প্রাণীর স্থানীয় মূল্য গরীব মিসকীনদেরকে দান করবে অথবা তা দ্বারা প্রাণী ক্রয় করে হারামের সীমানার ভিতরে জবাই করে দিবে কিম্বা তা দ্বারা গম ক্রয় করে মিসকীনদেরকে দিতে হবে। যে সমস্ত গাছ সাধারণত: কেউ রোপন করেনা- এমন কোন গাছ হারাম শরীফের সীমানার মধ্যে আপনা আপনি জন্মালে তা কাটা বা ভাঙ্গা নিষেধ। কাটলে বা ভাঙ্গলে তার মূল্য দান করা ওয়াজিব।

মনে রাখতে হবে যে, যে সব ভুল-ত্রæটির কারণে দম ওয়াজিব হওয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তা যদি কোন ওযর বশত: হয়, তাহলে দম-এর পরিবর্তে ছয় ফিতরা পরিমাণ অর্থ ছয়জন মিসকীনকে দান করলে বা তিনটা রোযা রাখলেও চলবে। তবে বিনা ওযরে হলে দমই দিতে হবে। আর যেসব ভুল-ত্রুটির কারণে সদকা ওয়াজিব হওয়ার বর্ণনা করা হয়েছে তা যদি ওযর বশত: হয়, তাহলে ‘সদকা’-এর পরিবর্তে তিনটা রোযা রাখলেও চলবে, তবে বিনা ওযরে হলে সদকাই দিতে হবে। ওযর বলতে বোঝানো হয়েছে-

(১) যে কোন ধরণের জ্বর বা মারাত্মক অসুস্থতা (২) প্রচন্ড গরম বা প্রচন্ড শীত, (৩) জখম, (৪) পূর্ণ মাথায় বা অর্ধেকে বেদনা, (৫) মাথায় খুব বেশী উকুন হওয়া, (৬) ঢুস লাগানো, (৭) রোগ বা শীতের কারণে মৃত্যুর প্রবল ধারণা হয়ে যাওয়া, (৮) যুদ্ধের জন্য অস্ত্রসজ্জিত হওয়া ইত্যাদি।

ইসলামে হজ্বের তাৎপর্য, ফাযায়েল ও মাসায়েল

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.