Home প্রবন্ধ-নিবন্ধ হিজরী সন: মুসলিম জাতির স্বকীয়তা

হিজরী সন: মুসলিম জাতির স্বকীয়তা

।। মুফতি আ ফ ম আকরাম হুসাইন ।।

ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে একটি বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। ১৪৪১ হিজরী শেষ হয়ে আজ ১৪৪২ হিজরী সনের সূচনালগ্ন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের দিকে সম্মন্ধ করে ‘হিজরী’ সাল গণনা শুরু হয়েছে। আরবী ভাষয়ায় ‘হিজরুন’ অর্থ ত্যাগ করা। হিজরুন মূলধাতু থেকে হিজরত শব্দটি নির্গত। হিজরত একটি ইসলামী পরিভাষা। ঈমানের হেফাজত এবং দ্বীনের প্রচার-প্রসারের মহান লক্ষ্যে দেশত্যাগ করাকে হিজরত বলে। হযরত ওমর রাযি. তখন মুসলিম জাহানের খলিফা। তাঁর নিকট একটি রাষ্ট্রীয় চিঠি এল; যাতে তারিখ উল্লেখ আছে কিন্তু সাল উল্লেখ নেই। চিন্তা করলেন, মুসলমানদের একটি নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ক্যালেন্ডার হওয়া উচিত। পরামর্শ সভা আহবান করলেন। হযরত আলী রাযি. এর মতের প্রেক্ষিতে ‘ঐতিহাসিক হিজরতের ঘটনার সাক্ষীস্বরূপ’ হিজরত থেকে ক্যালেন্ডারের হিসাব শুরু হল। আরব সমাজে পূর্ব থেকে প্রচলিত ১ম মাস মুহাররম ও ১২তম মাস জিলহজ্ব এর গণনা চলমান থাকে। সুতরাং ১৪৪২ হিজরী’ এর অর্থ হলো, আজ থেকে ১৪৪২ পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করেছেন।

হিজরত করা মূলত নবীদের সুন্নত। প্রায় সব নবীগণই হিজরত করেছেন। কুরআনুল কারীমে হযরত ইবরাহীম আ. হযরত মুসা আ. ও হযরত নূহ আ. এর হিজরতের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। যদিও সকলে হিজরত করেছেন তথাপি এ শব্দটি রাসূলুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের ক্ষেত্রে সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। ৫৭১ খৃষ্টাব্দে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়াতে আগমন করেন। ৪০ বছর বয়সে নবুওয়ত লাভে ধন্য হন। রাসূলের সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা এবং চরিত্র-মাধূর্য্যের খ্যাতি পুরো আরবজুড়ে বিস্তৃত ছিল। বাল্যকাল, শৈশব ও যৌবনকাল তিনি মক্কাতেই কাটিয়েছেন। নবুওয়ত প্রাপ্তির পর শত্রুরা রাসূলকে সবধরণের কষ্ট দিতে লাগল। ১৩ বছর মক্কায় দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। রাত-দিন মেহনত করেছেন। প্রচুর ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করেছেন। তাঁর ফিকির ছিল একটাই- আল্লাহকে ভুলা যাওয়া বান্দারা কিভাবে আল্লাহকে চিনতে পারে। আল্লাহর সাথে মুহব্বত ও ভালবাসার সম্পর্ক জুড়তে পারে। সকাল থেকে সন্ধ্যা সর্বদা বিভিন্ন অলি-গলিতে, হাট-বাজারে, পাড়ায়-মহল্লায়, গঞ্জে-গ্রামে ঘুরে ঘুরে তিনি দ্বীনের দাওয়াত দিতেন। মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাদের দিলের দরজায় কড়া নাড়তেন। কাউকে পেলেই দ্বীনের পথে আসার জন্য তোষামোদ করতেন। কিন্তু গুটি কয়েকজন ব্যতিত কেউ তার কথা শুনল না। অধিকাংশ মানুষের অবস্থা এমন ছিল যে, তারা হক্ব ও সত্যকে দিবালোকের ন্যায় বুঝতো কিন্তু মূর্তি পূজা ও ধর্মহীনতাকে ছাড়তে পারতো না। কেননা এটাই ছিল তাদের পূর্বপুরুষ ও বংশধরদের প্রাচীন ধারা।

আরও পড়তে পারেন-

সেকালে এমন কোন কষ্ট অবশিষ্ট ছিল না, যা তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেয়নি। রাসূলের পুরো পরিবারকে বয়কট করা হয়েছিল। প্রচ- ক্ষুধা ও তৃঞ্চার জ্বালায় নিরুপায় হয়ে রাসূল সপরিবারে গাছের পাতা পর্যন্ত ভক্ষণ করতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর পবিত্র শরীরে উটের নাড়ি-ভূড়ি ও ময়লা ইত্যাদি নিক্ষেপ করা হয়েছে। গলায় রশি বেঁধে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছে। চলার পথে কাঁটা বিছানো হয়েছে। উপহাস ও অবজ্ঞা করে তাকে দেখে হাত তালি দিত ওই পাপিষ্ঠরা। পাগল ও যাদুকর বলে তাঁকে অপমান করতে চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের অত্যাচার নির্যাতনের এক পর্যায়ে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মক্কা ছেড়ে মদীনায় হিজরতের অনুমতি পেলেন। রাসূলের সেই হিজরতের দিকে সম্মন্ধ করেই হিজরী সনের সূচনা হয়।

হিজরতের এই ঘটনা একদিকে মুসলমানদের ত্যাগ-কুরবানী এবং দ্বীনের হেফাজত ও প্রচার-প্রসারের জন্য রাসূল সা. এবং তাঁর সাহাবীদের তুলনাহীন ত্যাগের স্মারক। আর অন্যদিকে ভবিষ্যতে ইসলামের বিজয়ের জন্য এটি একটি মুকাদ্দমা বা ভূমিকা স্বরূপ। এটা শুধু মক্কা থেকে মদীনায় সফর ছিল না বরং এটা ছিল পরাজিত থেকে বিজয়ের, দূর্বলতা ও শোষিত থেকে শক্তি ও শাসকরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সফর। বাহ্যদৃষ্টিতে মুসলমানদের জন্য সংকীর্ণতা চেপে আসছিল কিন্তু মূলত এই সংকীর্ণতার মধ্যে আল্লাহ তায়ালা প্রশস্ততা ও সফলতাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। এই ঘটনা নিরাশ ব্যক্তির আশা সঞ্চারকারী। এই ঘটনা ঘোষণা করছে। হে দুনিয়াবাসী দেখো, কত ত্যাগ-তিতীক্ষা ও কুরবানীর বদৌলতে আল্লাহ এই দ্বীনের নিশান সমুন্নত করেছেন। কী পরিমাণ রক্তের বিনিময়ে সত্য ও সত্যের এই বটবৃক্ষ অংকুরিত হয়েছে।

ক্যালেন্ডার জাতির স্বকীয়তা ও পরিচয়ের অন্যতম মাধ্যম। এর মাধ্যমে জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য সুরক্ষিত থাকে। একটু ভেবে দেখুন ইসলামী ক্যালেন্ডার সম্পর্কে। এর প্রতিটি মাসের মধ্যে ইবাদতের ইঙ্গিত রয়েছে। মাসের নাম শোনামাত্রই ‘সে মাসের ইবাদতের দিকে মন চলে যায়। অন্যান্য ক্যালেন্ডারেও কিন্তু একই রহস্য লুকায়িত। তাতেও তাদের জাতি ও গোষ্ঠীর, চিন্তা-চেতনার ইঙ্গিত রয়েছে। মাস ও সপ্তাহের সাতদিনের নামের মধ্যেও লুকায়িত আছে এই সূক্ষ্ম রহস্য। লক্ষ্য করুন, সানডে’র দিকে। এর অর্থ সূর্যের দিন। তেমনি মানডে-এর দিকে, এর অর্থ চন্দ্রের দিন। তারা একদিন সূর্য্যরে ও একদিন চন্দ্রের পূজা করতো। ইবাদত করতো। এমনিভাবে বিভিন্ন মূর্তি ও দেব-দেবীর নামে মাস ও দিনের নামকরণ করা হয়েছে।

তাইতো হযরত ওমর রাযি. ইসলাম বিবর্জিত এই ক্যালেন্ডর সমর্থন করেননি। তিনি ওই ক্যালেন্ডার বর্জন করেছেন। আমাদের উচিৎ, ইসলামী ক্যালেন্ডার সম্পর্কে নিজে অবহিত হওয়া এবং এর ব্যপক প্রসার ঘটানো। আগামী প্রজন্মের নিকট এর গুরুত্ব ও ইতিহাস তুলে ধরে এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করা। ওলামায়ে কেরামের ফতোয়া মতে, ইসলামী ক্যালেন্ডার এর ব্যবহার চালু রাখা এবং এর ব্যপকতার জন্য প্রচেষ্টা চালানো উম্মতের উপর ফরজে কেফায়াহ। হিজরী তথা ইসলামী ক্যালেন্ডার আমাদের স্বকীয়তার স্মারক। এটা আমাদেরকে হিজরতের সেই ঐতিহাসিক ঘটনা মনে করিয়ে দেয়।

বর্তমানে ‘দেশত্যাগ’ করা একটি আন্তর্জাতিক বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। প্রতিটি দেশেই কিছু লোক পাওয়া যায়, যারা নিজ ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকুরী ইত্যাদির কারণে নিজ দেশত্যাগ করে অন্য কোথাও গিয়ে বসবাস করছেন। উন্নত রাষ্ট্রে এমন মানুষের সংখ্যা তূলনামূলকভাবে বেশী। তাদেরকে ‘মুহাজির’ বলা যাবে না। এ ক্ষেত্রে মুহাজির বলা হিজরত শব্দটিকে অপমান করার নামান্তর।

লেখক: সিনিয়র শিক্ষক- জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, আশরাফাবাদ, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা, সেক্রেটারী জেনারেল- জাতীয় ইমাম পরিষদ বাংলাদেশ, খতীব- চান সাদেক জামে মসজিদ, আলীনগর, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা। Email: [email protected]

উম্মাহ২৪ডটকম:এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।