Home অর্থনীতি গরিব-এতিম-মিসকিনদের হক কুরবানীর চামড়ার মূল্য নির্ধারণে নিষ্ঠুর ব্যবসায়িক কারসাজি নয় তো!

গরিব-এতিম-মিসকিনদের হক কুরবানীর চামড়ার মূল্য নির্ধারণে নিষ্ঠুর ব্যবসায়িক কারসাজি নয় তো!

0

।। রহিমা আক্তার মৌ ।।

মাঝারি মানের এক জোড়া স্যান্ডেল কিনতে গেলে কমপক্ষে দুই হাজার টাকা দিতে হয়। চামড়ার একটি ছোট্ট মানিব্যাগ কিনতে এক হাজার টাকা লাগে। মেয়েদের একটি চামড়ার ব্যাগ চার হাজার টাকার কমে পাওয়া যায় না। এক জোড়া চামড়ার জুতা কিনতে চার-পাঁচ হাজার টাকা লাগে। অথচ প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৪৫-৫০ টাকা; সত্যিই বিস্ময়কর মনে হচ্ছে।

আবারো মনে প্রশ্ন- চামড়া কেন আবর্জনার দরে বিক্রি হচ্ছে? আমাদের চামড়া শিল্পের কি পতন হয়েছে, নাকি দেশের মানুষ চামড়াজাত পণ্য বর্জন করেছে -এমন কোন খবর তো পত্রপত্রিকায় কখনো দেখা যায়নি। তাহলে শতভাগ গরীবের হক পবিত্র কুরবানীর পশুর চামড়ার মূল্য নিয়ে এই কারসাজি কেন?

মহান আল্লাহ আর্থিক সামর্থ্যবান মানুষের ওপর কোরবানি ওয়াজিব করেছেন। এই কোরবানির সাথে গরিব-এতিম-মিসকিনদের হকও জড়িয়ে রেখেছেন। ছোটবেলা থেকে আমরা দেখে আসছি, কোরবানির পশুর চামড়ার বিক্রিলব্ধ টাকা এতিম, গরিব-মিসকিনদের মাঝে বিতরণ করা হয় এবং বিভিন্ন মাদরাসা ও এতিমখানায় দেয়া হয়। অনেক মাদরাসা ও এতিমখানা চালানোর অর্থ সংস্থানের একটা অংশ আসে কোরবানির চামড়া থেকে। সেই চামড়ার মূল্য কমতে কমতে পাঁচ বছরের মাথায় মাত্র অর্ধেকে এসে দাঁড়িয়েছে।

ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। এর অর্ধেকের বেশি সংগ্রহ করা হয় কোরবানির ঈদের সময়। মোট চামড়ার ৬৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ গরুর, ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ ছাগলের, ২ দশমিক ২৫ শতাংশ মহিষের এবং মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ ভেড়ার চামড়া। ২০১৪ সালে ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৮৫-৯০ টাকা থাকলেও এ বছর তা মাত্র ৪৫-৫০ টাকায় নির্ধারণ হয়।

প্রতি বছর ঈদুল আযহা উপলক্ষে সরকার ও ব্যবসায়ীরা মিলে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে থাকেন। এবারো তাই হয়েছে। গত ৯ আগস্ট, কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করতে চামড়া শিল্পের উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, রফতানিকারক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের চামড়ার নতুন দামের কথা জানিয়ে দেন।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন এবার প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম গত বছরের চেয়ে পাঁচ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু সরকার পাঁচ টাকা করে কমিয়ে দিয়েছে। এবার ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দাম নির্ধারণ করা হয়। গত বছর প্রতি বর্গফুটের দাম ছিল ঢাকায় ৪৫ থেকে ৫৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। সারা দেশে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকায় এবার সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে ব্যবসায়ীদের। স্মর্তব্য, গত বছর খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২০ থেকে ২২ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৫ থেকে ১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

এ বছর বেশ সতর্ক অবস্থানে থেকে কম দামেই কোরবানির পশুর চামড়া কিনছেন আড়তদার এবং ট্যানারি মালিকরা। এ জন্য রাজধানীর পাড়া-মহল্লা থেকে চামড়া কিনে এনে লোকসান গুনতে হচ্ছে মওসুমি ব্যবসায়ীদের। পাড়া-মহল্লার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মূলত ফড়িয়া ও মওসুমি ব্যবসায়ীরাই কোরবানির চামড়া কিনে থাকেন। পরে তারা এসব চামড়া নিয়ে আসেন, রাজধানীর বেশ কিছু স্থানে কাঁচা চামড়ার অস্থায়ী বাজারে।

পাঁচ বছর আগে ট্যানারি মালিকরা প্রতি বর্গফুট চামড়ার ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছিলেন ৯০ টাকা। সেই ধারাবাহিকতায় পাঁচ বছর পর আজ সেই ঢাকায় সরকার ও ট্যানারি মালিকরা প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছেন ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। পাঁচ বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্বিগুণ। অথচ এর বিপরীতে, অর্ধেকে নেমে এসেছে চামড়ার দাম। বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজার ‘কিছুটা মন্দা’ থাকায় সরকারের বেঁধে দেয়া দামেই চামড়া কেনার চেষ্টা করছেন আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা। দেশে চামড়ার দাম কমে যাওয়ার একটি কারণ হলো ট্যানারি সাভারে সরে যাওয়া। চামড়া খাতের সমস্যা নিয়ে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, গত বছর কেনা চামড়ার ৪০ শতাংশ এখনো পড়ে আছে, যেগুলোর গুণগত মান অনেকটা নষ্ট হয়ে গেছে।

চামড়ার দাম কমে যাওয়ার ফলে চোরাচালানের মাধ্যমে দেশের বাইরে চামড়া পাচার হওয়ার আশঙ্কা থাকার কথা বলেন অনেকেই। এমন প্রশ্ন করা হলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) অত্যন্ত শক্তিশালী। এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেবে তারা।’

এলাকা থেকে সংগ্রহ করা পশুর চামড়া পাইকারদের কাছে বিক্রি করে থাকেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। গতবারের তুলনায় এবার দাম কম নির্ধারণ করায় মওসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোরবানির চামড়া কেনায় তাড়াহুড়া করছেন না আড়তদার কিংবা পাইকাররা।
আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা কমেছে এবং সাভারে চামড়া শিল্পপল্লী স্থাপিত হলেও ব্যবসায়ীরা ওখানে পুরোপুরি কাজ শুরু করতে পারেননি আজও। ফলে ঠিকমতো চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে না বলে এই বছর চামড়ার দাম কম ধরা হয়েছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।

কিন্তু অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা মতামত দিয়েছেন যে, নামমাত্র মূল্যে চামড়া বিক্রি করে গরিবের সম্পদ সুকৌশলে লুট করা হচ্ছে। ধনীরা কোরবানি দিয়ে গোশত খাচ্ছেন ঠিকই, অন্য দিকে গরিবের হক বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে পানির দরে। এতে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের অনেক এতিমখানা ও মাদরাসা। দুর্বলদের পাশে সাধারণত কেউ থাকে না। তেলা মাথায় তেল ঢালতে চায় সবাই। গরিবের অধিকার কেড়ে নিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়া অমানবিক। গত পাঁচ বছরে ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ২০১৪ সালে ৭৫-৮০ টাকা, ২০১৫ সালে ৫০ টাকা, ২০১৬ সালে ৫০-৫৫ টাকা, ২০১৭ সালে ৫০-৫৫ টাকা ও ২০১৮ সালে ৪৫-৫০ টাকা।

এই সময়ের মধ্যে সব কিছুর দাম দ্বিগুণ, তিনগুণ বৃদ্ধি পেলেও কুরবানীর মৌসুমে পশুর চামড়ার দাম ধাপে ধাপে কমতে কমতে অর্ধেকে নেমে এসেছে। চামড়ার ন্যায্য মূল্য ধরে রাখার বিষয়ে কথা ছিল সরকার শক্ত অবস্থান নিবে। অথচ আমরা দেখলাম তার বিপরীত চিত্র। গরীবদের এই হক রক্ষায় সরকার দৃশ্যতঃ বিপরীত ভূমিকাই নিয়েছে। #

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.