Home শীর্ষ সংবাদ ইভিএমে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে: একান্ত সাক্ষাৎকারে মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী

ইভিএমে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে: একান্ত সাক্ষাৎকারে মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী

0
উম্মাহ সম্পাদক মুনির আহমদকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী। ছবি- উম্মাহ।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দলের লক্ষ্য ও প্রস্তুতি, সমসাময়িক রাজনৈতিক ইস্যু এবং ইসলামী রাজনৈতিক দলসমূহের ঐক্যের সম্ভাবনা নিয়ে উম্মাহ ২৪ ডটকমকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ইসলামী রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ, ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরীক দল খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক, জামিয়া ইসলামিয়া লালমাটিয়ার সাবেক মুহাদ্দিস মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী।

পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি উম্মাহ পাঠক সমীপে নিম্নে প্রত্রস্থ করা হল-

উম্মাহঃ বর্তমান সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকী। আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আপনাদের দল খেলাফত মজলিসের অবস্থান ও প্রস্তুতি সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন?

মাওলানা আহমদ আলী কাসেমীঃ আমরা যেহেতু জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় আছি, আমাদের দলের সীমাবদ্ধতার মধ্যে যে প্রস্তুতি দরকার, সেটা আমাদের সব সময় আছে। আমরা মনে করি, গণপ্রত্যাশা মতে নিরপেক্ষ নির্দলীয় এবং জোটবদ্ধ নির্বাচন যদি হয়, আমরা ২০ দলীয় জোটের সাথে আমরা জোটবদ্ধ নির্বাচন করে বিজয় লাভ করব, ইনশাআল্লাহ। সেই লক্ষ্যকে সামনে নিয়েই খেলাফত মজলিসের প্রস্তুতি চলছে।

উম্মাহঃ খেলাফত মজলিশ ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরীক দল। জোটের অন্যতম দাবী হচ্ছে, দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন। এর সাথে যোগ হয়েছে জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারা মুক্তি। গত ২ সেপ্টেম্বর গণভবনে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে এই দুই দাবীর বিষয়ে সরকারের নেতিবাচক অবস্থান তথা অসম্মতিই ফুটে ওঠেছে। এই দুই দাবী পুরণ না হলে নির্বাচনে জোটের ভূমিকা কী হবে?

মাওলানা আহমদ আলী কাসেমীঃ খেলাফত মজলিস ২০ দলীয় জোটের শরীক দল। আর বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ২০ দলীয় জোটেরও নেত্রী। তাই বিএনপির পাশাপাশি আমরাও বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবী করি। আমরা মনে করি, ২০ দলীয় জোটের জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে রাজনৈতিক ভাবে পরাস্ত করার লক্ষ্যেই বেগম জিয়াকে জেলে রাখা হয়েছে। তবে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে রাজনীতিতে কি হয়, কোন পরিস্থিতি সামনে আসে, সেটা বলার মতো সময় এখনো আসেনি। জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি সরকার মেনে নিলে বা না নিলে কি হবে না হবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনই বলা যাচ্ছে না।

আর দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও স্বাচ্ছভাবে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবী আমাদের অনেক পুরনো। এখনো পর্যন্ত এই দাবী সরকার মেনে নিবে না বলে যত যাই বলুক, আমরা আশাবাদি সরকার জনপ্রত্যামার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে যৌক্তিক এই দাবী মেনে নিবে এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের পথ কণ্টক মুক্ত করবে। তাছাড়া এমনও তো হতে পারে, নির্বাচন কমিশনকে একটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন করার মতো সুযোগ এবং স্বাধীনতা দিয়েও বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।

উম্মাহঃ গত ৩০ আগস্ট নির্বাচন কমিশন ইভিএমে (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ভোট গ্রহণের বিধান রেখে আরপিও সংশোধনের প্রস্তাব করেছে। ইতিমধ্যেই দেড় লাখ ইভিএম ক্রয়ের প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেছে বলে খবরে জানা গেছে। জাতীয় নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নিয়ে বর্তমানে তুমুল বিতর্ক চলছে। এর মধ্যে বিবৃতি দিয়ে আপনাদের দলের মহাসচিব ইভিএম ভোট গ্রহণের বিরোধীতা করে বক্তব্য দিয়েছেন। খেলাফত মজলিস ইভিএম এর কেন বিরোধীতা করছে এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ইভিএম-এর সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে না আসলে আপনাদের দলের ভূমিকা কী হবে?

মাওলানা আহমদ আলী কাসেমীঃ একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন করার জন্য আমরা মনে করি না যে, ইভিএমএর কোন প্রয়োজন আছে। নির্বাচন কমিশিনের সাথে আলোচনার সময়ও আমরা দলীয়ভাবে এর বিরোধীতা করেছি। তাছাড়া তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে আমাদের দেশের জনগণ এখনো সেভাবে অবগত নয়। আর ইভিএম এ যেভাবে ভোট হ্যাকিং করা যায়, যা আমরা বিভিন্নভাবে শুনছি, তাতে এই ইভিএম দিয়ে নিরপেক্ষ ও বিতর্ক মুক্ত নির্বাচন করা কখনো সম্ভব নয়। ইভিএমে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। আমরা মনে করি, সরকার নির্বাচনী দূরভীসন্ধি থেকে নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করে এই ইভিএম যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতিপূর্বে ইভিএম ব্যবহার করে স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হয়েছে। যে কারণে ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের অনেক দেশে ইভিএম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও ইভিএম নিয়ে জোর রাজনৈতিক বির্তক চলছে। যে কারণে ভারতেও ইভিএম নিষিদ্ধের দাবি তীব্র জোরালো রূপ নিয়েছে। সুতরাং বিভিন্ন দেশে পরীক্ষিত একটা ব্যর্থ জিনিসকে নতুন করে আমরা আবার পরীক্ষা করে কি ফলাফল লাভ করতে পারি?

আমরা আশা করছি, সরকার ও নির্বাচন কমিশন ইভিএম এর সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসবে। আর ইভিএম এর সিদ্ধান্ত থেকে নির্বাচন কমিশন ফিরে না আসলে সে বিষয়ে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দলীয়ভাবে আমরা করণীয় স্থির করব।

উম্মাহঃ বাংলাদেশে কওমি ধারার বেশ কয়েকটি ইসলামী রাজনৈতিক দল রয়েছে। কিন্তু দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য, অবিশ্বাস ও সন্দেহ বেশ জোরালোই বলা চলে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে জোট গঠন ও মেরুকরণের একটা প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ পর্যায়ে ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনী ঐক্যের সম্ভাবনা কতটা আছে বলে মনে করেন?

মাওলানা আহমদ আলী কাসেমীঃ ইসলামী দল যারা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত, আমরা দেখেছি তারা বিভিন্নভাবে কোন না কোন জোটের সাথে আছে। যেমন খেলাফত মজলিস এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, তারা ২০ দলের সাথে আছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, তারা আছে এরশাদের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে। আরেকটা দল যদিও তারা কোন জোটের সাথে এখন নেই, কিন্তু তাদের কার্যকলাপ ও বক্তব্য থেকে বুঝা যায়, তারাও যে একটা গোষ্ঠীর সমর্থন করে সেটা প্রায় স্পষ্ট। সুতরাং নতুন করে এমন উল্লেখযোগ্য কোন দল আবার নতুন উদ্যোগে পৃথক প্লাট ফরমে জোটবদ্ধ হবে- এমন কোন সম্ভাবনা আমি দেখছি না।

ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনী ঐক্যের সম্ভাবনা কতটা আছে বলে যে প্রশ্ন সামনে এনেছেন, তার উত্তরে আমি বলব, সেরকম কোন সম্ভাবনা আদৌ আমি দেখি না। সেরকম জোরালো কোন উদ্যোগ বা প্রক্রিয়াও নাই। এমন হয় যে, ইসলামী রাজনৈতিক দলসমূহের নেতৃবৃন্দ ব্যক্তিগত পরিসরে ঐক্যোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলাপ আলোচনা করেন এবং সকল ইসলামী দলের পৃথক একটা ঐক্যবদ্ধ প্লাট ফরম তৈরির তাগিদ গভীরভাবে অনুভব করেন। আমরা যারা প্রয়োজন ও তাগিদ মনে করি, আমরা দেখি যে বিভিন্ন দল লেজুড়বৃত্তি করে বিভিন্ন দল ও জোটের সাথে মিশে গেছে। নানান স্বার্থের কারণে এই জায়গা থেকে ফিরে এসে পৃথক জোট গঠন করা ইসলামী রাজনৈতিক দলসমূহের জন্য কতটা বাস্তবিক চিন্তা, এই নিয়ে আমার বিস্তর সন্দেহ ও হতাশা আছে। বস্তুতঃ ইসলামী রাজনৈতিক দলসমূহ যদি এক হয়ে একই প্লাট ফরম থেকে রাজনীতি করতে পারত বা নির্বাচনী ঐক্য গড়ে তুলতে পারত, তখন দেশ ও উম্মাহ অনেক বেশি উপকৃত হতে পারত। এই এক হতে না পারাটা আমাদের জন্য বড়ই হতাশা ও লজ্জার।

উম্মাহঃ ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের জন সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কোনটাকে আপনি দায়ী করবেন?

মাওলানা আহমদ আলী কাসেমীঃ সবচেয়ে বড় বাধা আমি যেটা মনে করি, সেটা হল নিজের স্বার্থ, দলীয় স্বার্থ এবং ব্যক্তিগত আরো অনেক স্বার্থ অনেকের সাথে জড়িয়ে আছে। এগুলোই আমাদের ঐক্যের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

উম্মাহঃ ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন একটা নির্বাচনী জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন এবং এই নিয়ে সরব আলোচনাও চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। এই নিয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই। খেলাফত মজলিশের অভ্যন্তরে এই নিয়ে কোন আলোচনা হয়েছে কিনা?

মাওলানা আহমদ আলী কাসেমীঃ আমাদের অভ্যন্তরে এ বিষয়ে দলীয় কোন আলোচনা হয়নি। তবে আমরা ড. কামাল ও বদরুদ্দোজার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তাঁরা যতটুকু এগিয়েছেন, এটা আরো সুন্দরভাবে সবাইকে নিয়ে যদি আগায় এবং বিশেষভাবে দেশ ও জনগণের স্বার্থে যদি এই উদ্যোগ হয়, কারো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে যদি না হয়, তাহলে এই উদ্যোগ থেকে ভাল একটা ফলাফল আমরা আশা করতে পারি।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন উম্মাহ সম্পাদক মুনির আহমদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.