Home ওপেনিয়ন ঐক্যের প্রয়াসে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জনপ্রত্যাশা পুরণে মনোযোগী হতে হবে

ঐক্যের প্রয়াসে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জনপ্রত্যাশা পুরণে মনোযোগী হতে হবে

0

মজিবুর রহমান মঞ্জু। – ফাইল ছবি।

।। মজিবুর রহমান মঞ্জু ।।

যেখানে যাই একটাই প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত ঐক্য হবে তো? কী উত্তর দেবো বুঝতে পারি না। শুধু বুঝতে পারি জাতীয় ঐক্য নিয়ে জনমনে প্রবল আশাবাদ তৈরী হয়েছে। মানুষের মধ্যে মুক্তির যে তৃষ্ণা যে কোন কিছুকে আঁকড়ে ধরে তারা তা পেতে চাইছে।

ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে যারা কাজ করছেন তাঁরা কী এই আকাংখা উচ্ছ্বাসের তীব্রতা টের পাচ্ছেন? তাঁরা কী বুঝতে পারছেন, সাধারণ মানুষ কী চায় তাদের কাছে? পাড়া, মহল্লায়, চায়ের আড্ডায় মানুষ বলছে- এখন বিভেদের সময় নয়। এরকম একটি জাতীয় প্রয়োজনের সময় কে, কী, কার কেবলা কোথায়, কার ভোট কত, কে কার এজেন্ট, – এসব কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ি মানুষ দেখতে চায় না।

জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে অমুক হলে আমি নাই, তমুক কে ছেড়ে তারপর আসতে হবে- এসব ডেট এক্সপায়ার্ড শর্ত শুনলে মানুষ বিরক্ত হয়। কে কত সীট চায়? ক্ষমতা ভাগাভাগি করে কে প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী হবেন- এসব বিষয়ে প্রচারণা জনগণের মনে চরম হতাশার জন্ম দেয়। এসব আলোচনায় মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে। ভুল বুঝতে পারে। তারা মনে করতে পারে এই ঐক্য তো তাদের ক্ষমতা পাওয়ার ঐক্য। আমাদের মুক্তির ঐক্য নয়।

মানুষ ঐক্য চায় ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তির জন্য। সাম্য ও ন্যায়বিচারের নতুন এক বাংলাদেশের জন্য। প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময় শত্রু-মিত্র ভেদ থাকে না। সবাই একাট্টা হয়ে বাঁচতে হয়।

যতটুকু জানতে পেরেছি, এখনো জাতীয় ঐক্যের কোন রুপরেখা তৈরী হয়নি। তৈরী হয়নি কোন সম্মিলিত সনদ, ঘোষণাপত্র কিংবা অঙ্গীকার। যার ভিত্তিতে গড়ে উঠবে জনতার আশাবাদ বা ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। অথচ ঐক্য নিয়ে মানুষের আশা আকাশ ছুঁতে চলেছে। কোন কারণে যদি এ ঐক্য কার্যকর কোন ফল আনতে না পারে- তাহলে যাদের নিয়ে আলোচনা চলছে তাঁরা মানুষের আস্থা বিশ্বাস চিরতরে হারিয়ে ফেলবেন। যদি তাঁরা মানুষের আশা ও স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটাতে পারেন, তাহলে তাঁরা জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হবেন।

আমাদের দেশের জনগণ দুর্ভাগ্যজনক ভাবে নানা মত ও পথে বিভক্ত। বহুদিন পর তাদের মাঝে একটি ঐক্যবদ্ধ হবার চেতনা তৈরী হয়েছে। এটা একটা ঐতিহাসিক ‘অপরচুনিটি’। অতএব, সংশ্লিষ্টরা দয়া করে যত্নশীল ও যথার্থ মনোযোগী হয়ে পদক্ষেপ নেবেন বলে আমরা আশাবাদী।

একটি কথা শোনা যাচ্ছে, ঐক্যপ্রক্রিয়ায় সংযুক্ত পক্ষগণ মালয়েশিয়ার মডেল ফলো করে আগামীতে সরকার গঠনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছেন। মালোয়েশিয়ার সাম্প্রতিক নির্বাচনে মাহাথিরের নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এসেছে। মাহাথিরের দল সংসদে আসন পেয়েছে খুবই কম। জোটের প্রধান আনোয়ার ইব্রাহিমের দল ১১০ এর বেশী আসন পেয়েও নেতৃত্ব তুলে দিয়েছেন তাঁর জীবনঘাতি সাবেক রাজনৈতিক শত্রু স্বল্প সীটের মাহাথিরের হাতে। প্রশ্ন হলো কেন?

মালোয়েশিয়ার জনগণ এই কেন’র উত্তর আগেই জানতেন। নির্বাচনের আগেই এই আপোসরফা বা চুক্তির কারণটা জনগণের কাছে পরিষ্কার ছিল। ফলে জনগণ সেভাবেই ম্যান্ডেট দিয়েছে।

তাই আমাদের ঐক্য প্রচেষ্টার পক্ষগুলোকে বলবো, আপনাদের ভেতরকার আলোচনা ও চুক্তি কতটুকু জনগণের স্বার্থে তা পরিস্কার করুন। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ভোটাধিকার, ইনসাফ এবং সুশাসন জনগণের একমাত্র চাওয়া। আপনারা জোটবদ্ধ হয়ে কীভাবে এই দূ:শাসন থেকে দেশকে উদ্ধার করবেন- তা আগে পরিস্কার করুন। এই নিকষ কালো দূ:শাসনের অবসান না ঘটলে কীভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, আর কীভাবেই বা আপনারা মালোয়েশিয়ার মডেলে ক্ষমতায় বসবেন এবং সরকার চালাবেন, তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।

আপনারা অনেক প্রাজ্ঞ এবং জ্ঞানী। আপনারা একমঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেই সরকার ভয় পেয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করবে- এটা যদি ভাবেন, তাহলে আপনাদের ‘প্রাজ্ঞতা’ নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন উঠবে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক শক্তিগুলো আপনাদের এই মহাঐক্য দেখলে খুশীতে ‘মহাচাপ’ দিয়ে সরকার কে রাতারাতি অবাধ নির্বাচন দিতে বাধ্য করে ফেলবে, এরকম বালখিল্য চিন্তা নিশ্চয়ই আপনারা করছেন না!

তাহলে কী? তাহলে পথ এবং পন্থা একটাই। শুধু আপনারা রাজনৈতিক নেতাদের ঐক্য হলে হবে না। জনগণের ঐক্যও লাগবে। আপনারা এক মঞ্চে আসলে হবে না, সাথে সাথে জনতাকেও এক কাতারে এক মানবসমূদ্রের উত্তাল মিছিলে আনতে হবে।
বাম, ডান, উত্তর, দক্ষিণ, ইসলামপন্থী, সেক্যুলার, কমিউনিস্ট, বুদ্ধিজীবি, সিভিল সোসাইটি, আলেম-উলামা, নারীবাদী, ছাত্র-ছাত্রী, কৃষক, মজুর, সর্বস্তরের পেশাজীবি; অর্থাৎ ঐক্যটা হতে হবে স্বাধীনতাকামী, ফ্যাসিবাদ বিরোধী এবং সর্বত্র ইনসাফ ও সুবিচারকামী সর্বসাধারণের ঐক্য।

প্লিজ আপনাদের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ, ইতিহাসের এই ‘গ্রেট অপরচুনিটি’ কে নষ্ট করবেন না। সঠিক উপলব্ধি থেকে এই মুক্তির আন্দোলনে নেতৃত্ব দিন। কথা দিলাম, ইতিহাসের পাতায় আপনাদের নাম লেখা থাকবে।

লেখক: সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.