Home জাতীয় ‘ঐ যে কচুরিপানা দেখা যায় তার ওপাশে আধ-কিলোমিটার দূরে আমার বাড়িটা ছিল‘

‘ঐ যে কচুরিপানা দেখা যায় তার ওপাশে আধ-কিলোমিটার দূরে আমার বাড়িটা ছিল‘

0

: শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় মুলফৎগঞ্জ বাজারটি তিনশো বছরের পুরনো। বাজারের দু’পাশে দোকান। তার মাঝখান দিয়ে একটি রাস্তা চলে গেছে। এই রাস্তাটি যাওয়ার কথা চন্ডিপুর লঞ্চঘাট পর্যন্ত। কিন্তু হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেছে রাস্তাটি, যেন পদ্মায় গিয়ে পড়েছে।

এই রাস্তাটি ধরেই যেতে হতো নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু ওই ভবনের একটি অংশও ভেঙে পড়ে আছে পদ্মায়। কাছেই একটি ব্রিজ, কিন্তু সেটিও ভেঙে পড়েছে। মুলফৎগঞ্জ বাজারের দোকানও একটি একটি করে বিলীন হয়ে গেছে পদ্মায়। তীরে পড়ে আছে ইট-সুরকি। অনেক দোকানি দোকানের ঘর ভেঙে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। বাজারের অনেক দোকান এখনো খোলা রয়েছে। কিন্তু কিসের যেন অপেক্ষায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

নড়িয়ার মুলফৎগঞ্জ, কেদারপুর, দাসপাড়া, বুন্যা, চন্ডিপুর এরকম অনেক এলাকায় হেঁটে হেঁটে চোখে পড়লো প্রকৃতির ভয়াবহ নারকীয়তার চিহ্ন। বানি শীল দাসপাড়ার একজন বাসিন্দা। বলছিলেন, “রাতে খেতে বসছি। হঠাৎ ভাঙন শুরু হইছে। ঘরবাড়ি ফেলে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি। চোখের সামনে সব নিয়ে গেলো। এখন কোথাও থাকার জায়গা নেই। আমরা এখন রাস্তায় থাকি।”

নদীর ধারে এখনো রয়ে গেছে ভেঙে যাওয়া বহু ভিটে। ইটের বাড়ি ভেঙে নদীতে তলিয়ে যাওয়ার আগেই অনেক মালিক যতোটুকু সম্ভব সেখান থেকে ইট কাঠ খুলে টেবিল চেয়ার খাট বিছানা সরিয়ে নিয়ে গেছেন। আশপাশে এখনো অনেকেই আছেন যারা শেষ সম্বলটুকু বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। টিনের চাল খুলে কাছেই কোন একটি মাঠে অথবা অন্য কারো বাড়ির উঠানে বা রাস্তার ধারে রেখেছেন সেসব।

পারভীন বেগম, তার স্বামী ও দুই বাচ্চা নিয়ে কেদারপুরে মাজারের দিকে যেতে একটি মাঠে টিনের চালটুকু রেখেছেন। তার মাঝে স্তূপ করে রাখা বালিশ, তোশক, বালতি, হাড়ি-পাতিল। তিনি বলছেন, “চারবার ভাঙন দেখছি। এই নিয়া চারবার সব হারাইলাম। এখন মাইনসের জমিতে সাতদিন ধইরা রইছি। এইবার আর কোথাও যাবো না। এইখানেই পড়ে থাকবো।”

সব মানুষের চোখে মুখেই ভয়ের ছাপ। কখন আবার ভাঙবে তীর, সেই আতংকে রয়েছেন তারা। এখনো যাদের বাড়ি ঘর ভাঙেনি তারা নদীর দিকে চেয়ে আছেন। চারিদিকে শুধু সব হারানো মানুষের আকুতি।

নুর হোসেন দেওয়ান ও তার পরিবার ছিল এলাকার সবচাইতে বিত্তশালী পরিবারের একটি। তাদের বাড়ি, একটি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, একটি শপিং মল, স্টিলের আলমারির কারখানা আর ঔষধের দোকানসহ প্রায় একশ একর জমি বিলীন হয়ে গেছে পদ্মার গর্ভে।

প্রথমে কিছুদিন মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা। এখন কয়েক ছেলেকে নিয়ে ভাঙা হাসপাতালের অবশিষ্ট একটি ঘরে আছেন। বাড়ির মেয়েদের পাঠিয়ে দিয়েছেন দূরে আত্মীয়ের বাড়িতে।

ভাঙা তীরে দাঁড়িয়ে দুরে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলছিলেন, “ঐ যে কচুরিপানা দেখা যায় তার ওপাশে আধ-কিলোমিটার দূরে আমার বাড়িটা ছিল। বাড়ির একটা বড় গেট ছিল। আগে টেবিলে বসে ভাত খেতাম আর এখন ফ্লোরে পাতা বিছানায় বইসা খাই। সেখানেই ঘুমাই। লজ্জায় কারোর কাছে সাহায্যও চাইতে পারি না।”

এ বছরের বর্ষা মৌসুমে গত আড়াই মাস ধরে ভাঙন শুরু হয়েছে এই এলাকায়। সরকারি হিসেবে দুই কিলোমিটার জায়গা চলে গেছে নদীর গর্ভে। ভাঙন এখানে নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবার চর ছাড়িয়ে নদীর ছোবল এসে পড়েছে লোকালয়ে। তাই ক্ষয়ক্ষতি আর আহাজারি অনেক বেশি। পাঁচ হাজারেরও বেশি পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছে। তিনটে বাজার, দুটো লঞ্চ ঘাট, কমিউনিটি ক্লিনিক, হাসপাতাল, মসজিদ, মন্দির, স্কুল – এরকম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ একটি পুরো লোকালয় যেন ধীরে ধীরে নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

কিছুদিন আগেও যার অনেক কিছু ছিল আর যার কিছুই ছিল না, তারা সবাই এখন এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছেন নড়িয়ার খোলা আকাশের নিচে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.